ঢাকা ২০২৫ : বেঁচে থাকা যখন বিলাসিতা

ঢাকা ২০২৫ : বেঁচে থাকা যখন বিলাসিতা

২০২৫ সালের ক্যালেন্ডারের পাতা যখন শেষের দিকে, ঠিক তখনই ঢাকা মহানগরী দাঁড়িয়ে আছে এক অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সন্ধিক্ষণে। এই সেই ঢাকা, যাকে একসময় বলা হতো ‘স্বপ্নের ফেরিওয়ালা’। গ্রাম আর মফস্বল থেকে লাখো মানুষ ভাগ্য বদলের আশায় যে শহরে ছুটে আসত, আজ সেই শহরটিই তার মধ্যবিত্ত বাসিন্দাদের জন্য পরিণত হয়েছে এক কঠিন যুদ্ধক্ষেত্রে।

আজ ঢাকার বাতাস কেবল ধূলিকণায় ভারী নয়; অসংখ্য মধ্যবিত্ত পরিবারের দীর্ঘশ্বাসে তা আরও বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। বর্তমান বাজারব্যবস্থার অস্থিরতা আর আয়ের সীমাবদ্ধতার যে দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তা স্পষ্টতই একটি বড়সড় সামাজিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা আতঙ্কিত কণ্ঠে একে অভিহিত করছেন ‘নীরব সংকট’ বা ‘সাইলেন্ট ক্রাইসিস’হিসেবে।
আমরা সেই নির্জীব সংখ্যার আড়ালে থাকা রক্ত-মাংসের মানুষের হাহাকার, তাদের নিত্যদিনের আপস আর অস্তিত্ব রক্ষার মরণপণ সংগ্রামকে উন্মোচন করতে চাই। চালের দানা থেকে শুরু করে মাথার ওপরের ছাদ, সন্তানের স্কুলের বেতন থেকে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ-জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যয়বৃদ্ধির যে সুনামি আঘাত হেনেছে, তা একটি টেকসই সমাজকাঠামোর জন্য অশনিসংকেত।
মধ্যবিত্ত শ্রেণি যেকোনো অর্থনীতির মেরুদণ্ড। তারা একাধারে ভোক্তা, সঞ্চয়কারী এবং দক্ষ মানবসম্পদের জোগানদাতা। কিন্তু ২০২৫ সালের ঢাকার বাস্তব চিত্র বলছে-এই মেরুদণ্ড আজ বাঁকতে শুরু করেছে। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব), বিবিএস, টিসিবি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সর্বশেষ উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে একটি ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। আয়ের সাথে ব্যয়ের সামঞ্জস্য রাখতে গিয়ে মধ্যবিত্ত আজ শেষ সম্বল সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে। পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে খাদ্যাভ্যাস। এমনকি পিঠ ঠেকে যাওয়ায় অনেকেই আজ শহর ছেড়ে গ্রামের পথ ধরতে বাধ্য হচ্ছেন।

অর্থনীতির চিরায়ত তত্ত্বে মুদ্রাস্ফীতি আর মজুরি বৃদ্ধির মধ্যে একটি সহনশীল সম্পর্ক থাকার কথা। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় সেই তত্ত্ব অকার্যকর। গত ৪৪ মাস ধরে টানা মজুরি প্রবৃদ্ধি পড়ে আছে মুদ্রাস্ফীতির হারের নিচে। সহজ কথায়, প্রায় চার বছর ধরে মানুষের ‘প্রকৃত আয়’ বা রিয়েল ইনকাম ক্রমাগত কমছে।

বিবিএস-এর তথানুসারে, ২০২৫ সালের নভেম্বরে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮.২৯ শতাংশ। কিন্তু খাদ্য মূল্যস্ফীতির চিত্র ছিল আরও ভয়াবহ। অন্যদিকে, মজুরি বৃদ্ধির হার আট শতাংশের ঘরেই আটকে আছে, যা বাজারের প্রকৃত আগুনের সাথে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এই পরিসংখ্যানের একটি ভীতিজাগানিয়া দিক রয়েছে। সরকারি হিসাবে যে মূল্যস্ফীতি দেখানো হয়, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের ‘ব্যক্তিগত মূল্যস্ফীতি’ তার চেয়ে বহুগুণ বেশি। কারণ, নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের আয়ের একটি বিশাল অংশ-প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশই-খরচ হয়ে যায় কেবল দুমুঠো খাবারের পেছনে। যখন খাদ্যপণ্যের দাম ১০-১২ শতাংশ হারে বাড়ে, তখন তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির চেয়ে অনেক দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকে।
বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর পূর্বাভাস ছিল, ২০২৫ সালে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম কমবে। কিন্তু টাকার অবমূল্যায়নের কারণে বাংলাদেশ সেই সুফল থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় ভোজ্যতেল, চিনি, ডাল এবং জ্বালানির মতো আমদানিকৃত পণ্য কিনতে হচ্ছে চড়া দামে। এই ‘আমদানিকৃত মূল্যস্ফীতি’ (Imported Inflation) স্থানীয় সিন্ডিকেট আর দুর্বল সরবরাহ ব্যবস্থার সাথে মিলে তৈরি করেছে এক বিষাক্ত চক্র।

বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের পদক্ষেপগুলো-যেমন টিসিবির মাধ্যমে খোলা বাজারে পণ্য বিক্রি (ওএমএস)-চাহিদার তুলনায় সাগরে এক ফোঁটা জলের মতো। সিন্ডিকেট বা অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি রোধে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তা হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘ইঁদুর-বিড়াল খেলা’র মতো। জরিমানা করার কয়েক দিন পরেই ব্যবসায়ীরা আবার দাম বাড়িয়ে উসুল করে নিচ্ছেন। বিশেষ করে ভোজ্যতেল ও পেঁয়াজের মতো পণ্যের পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে গুটিকয়েক বড় কর্পোরেট হাউজ, যা মুক্ত বাজার অর্থনীতির মূলনীতির পরিপন্থী। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যাংকিং ও বিচার বিভাগে সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও তৃণমূলের বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে হিমশিম খাচ্ছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগে অসাধু চক্রগুলো হয়ে উঠেছে আরও বেপরোয়া। আর এই যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ।
বাঙালির পাতে ভাত না থাকলে চলে না। তাই চালের দাম বাড়লে তা সরাসরি আঘাত করে জনজীবনের স্বস্তিতে। ২০২৫ সালের অক্টোবর-নভেম্বর মাসে চালের বাজার ছিল চরম অস্থিতিশীল। খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে চালের একক অবদান ছিল প্রায় ৪৭.০১ শতাংশ-যা নিকট অতীতে নজিরবিহীন।

ঢাকার কারওয়ান বাজার, কাপ্তান বাজার বা মিরপুর ১ নম্বরের কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা যায়, সরু চালের (নাজিরশাইল বা মিনিকেট) কেজি বিক্রি হচ্ছে ৭৫ থেকে ৮৫ টাকায়। অথচ গত বছর এই সময়ে দাম ছিল ৬৪ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে। এক বছরে কেজিতে দাম বেড়েছে ১০ টাকারও বেশি। পাঁচ সদস্যের একটি পরিবারে মাসে ৩০ কেজি চাল লাগলে, কেবল এই খাতেই বাড়তি গুনতে হচ্ছে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা।

নিম্নবিত্তের ভরসা মোটা চালের (স্বর্ণা বা গুটি) দামও ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। এই মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি তাদের ক্যালরি গ্রহণের ওপর আঘাত হানছে। মিল মালিকরা ধান সংগ্রহ, জ্বালানি ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধিকে দায়ী করলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা। ভরা মৌসুমে চালের দাম না কমাটা অস্বাভাবিক। এর পেছনে করপোরেট গ্রুপগুলোর বাজারে প্রবেশ এবং কৃত্রিম মজুতদারির কৌশল বা ‘সিন্ডিকেট’ বড় ভূমিকা রাখছে। খোলা বাজারে ওএমএস-এর দীর্ঘ লাইন প্রমাণ করে-মানুষ কতটা অসহায়।
শীতকাল মানেই বাংলাদেশে সবজির সমারোহ। ফুলকপি, বাঁধাকপি, শিম, লাউয়ে বাজার ভরে ওঠার কথা। দাম থাকার কথা সাধারণের নাগালে। কিন্তু ২০২৫ সালের শীতে ঢাকার চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। সরবরাহে ঘাটতি না থাকলেও সবজির দাম আকাশচুম্বী।

ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ঢাকার বাজারের চিত্র ছিল এমন-দেশি পেঁয়াজ ১৩০-১৪০ টাকা (স্বাভাবিক সময়ে ৪০-৫০ টাকা)। নতুন আলু ১৫০-১৬০ টাকা (মৌসুমের শুরুতে এত দাম নজিরবিহীন)। কাঁচা মরিচ ৭০-১০০ টাকা। বেগুন ৮০-১২০ টাকা (গত শীতে ছিল ৪০-৫০ টাকা)। শিম ৬০-৮০ টাকা। ফুলকপি/বাঁধাকপি ৪০-৬০ টাকা (প্রতি পিস)।
উত্তরাঞ্চল ও কুমিল্লা অঞ্চলের সাম্প্রতিক বন্যায় ফসল নষ্ট হওয়া এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিকে বিক্রেতারা দায়ী করছেন। কিন্তু ভোক্তাদের অভিযোগ, কৃষকরা যে দাম পান, ঢাকায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে তা তিন-চার গুণ বেড়ে যায়। মধ্যস্বত্বভোগী আর বাজার কমিটির কারসাজিতেই এই আগুন জ্বলছে।
মধ্যবিত্তের আমিষের চাহিদা মেটানোর প্রধান উৎস ব্রয়লার মুরগি, ফার্মের ডিম আর পাঙাশ-তেলাপিয়া। কিন্তু এই পণ্যগুলোর দামও এখন এমন পর্যায়ে, সপ্তাহে একদিন পাতে আমিষ জুটানো অনেকের জন্য চ্যালেঞ্জ। গরুর মাংস ৭৫০-৮০০ টাকা কেজি-যা মধ্যবিত্তের জন্য এখন বিলাসিতা। খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে মাছের অবদান ছিল প্রায় ৩৯ শতাংশ। ভরা মৌসুমেও সাধারণ মানুষ ইলিশের স্বাদ নিতে পারেনি।
সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে ডিমের বাজারে। ডিমকে বলা হয় ‘গরিবের প্রোটিন’। সেই ডিমের ডজন কিছুদিন আগেও ১৮০-১৯০ টাকায় উঠেছিল। বর্তমানে কিছুটা কমলেও একটি ডিমের দাম ১৫ টাকার কাছাকাছি। চার সদস্যের পরিবারে প্রতিদিন সকালে একটি করে ডিম খেলেও মাসে খরচ হয় ১৮০০ টাকা! যা অনেক পরিবারের মাসিক বাজেটের ১০ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে রিফাইনারি কোম্পানিগুলো সরকারের অনুমতি ছাড়াই তেলের দাম বাড়িয়েছে। বোতলজাত সয়াবিন তেল লিটার প্রতি ১৯৮ টাকায় পৌঁছেছে। পেঁয়াজের বাজারেও চলছে একই খেলা। ভারত থেকে আমদানি ব্যাহত হওয়ার খবরে দেশি পেঁয়াজ ১৩০-১৪০ টাকায় ঠেকেছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ভেজালের আতঙ্ক। ভেজাল গুড় ও খাদ্যের খবরে ভোক্তারা দিশেহারা, তবুও উচ্চমূল্যে পণ্য কিনতে তারা বাধ্য।

ঢাকা শহরে জীবনযাত্রার ব্যয়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক খাত হলো আবাসন। একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক আয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ বা তারও বেশি চলে যায় বাড়িভাড়ায়। অথচ বিনিময়ে তারা পায় না কোনো নিরাপত্তা বা যথাযথ সেবা।
‘বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১’কেবল বইয়ের পাতাতেই আছে। বাস্তবে এর কোনো প্রয়োগ নেই। প্রতি বছর জানুয়ারি এলেই বাড়িওয়ালারা বিনা নোটিশে ভাড়া বাড়িয়ে দেন। গত ২৫ বছরে ঢাকায় বাসা ভাড়া বেড়েছে ৪০০ শতাংশ, যা নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির হারের চেয়েও প্রায় দ্বিগুণ।

মিরপুর, মোহাম্মদপুর বা রামপুরার মতো মধ্যবিত্ত এলাকায় দুই কক্ষের একটি মানসম্মত ফ্ল্যাটের ভাড়া এখন ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। এর সঙ্গে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ও জেনারেটর বিল মিলিয়ে খরচ দাঁড়ায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। অথচ একজন এন্ট্রি লেভেল বা মিড-লেভেল বেসরকারি চাকরিজীবীর বেতন ৪০ থেকে ৬০ হাজার টাকার মধ্যে। অর্থাৎ, আয়ের অর্ধেক বা দুই-তৃতীয়াংশই চলে যাচ্ছে বাড়িওয়ালার পকেটে। জুবায়ের ইসলামের মতো হাজারো ভাড়াটিয়া প্রতি জানুয়ারিতে আতঙ্কে থাকেন-কখন নোটিশ আসবে, ‘ ভাড়া বাড়ল, না পারলে বাসা ছাড়ুন।’

ভাড়ার জাঁতাকল থেকে বাঁচতে অনেকেই নিজের একটি ফ্ল্যাট কেনার স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু রিয়েল এস্টেট খাতের বর্তমান অবস্থা সেই স্বপ্নকে দুমড়েমুচড়ে দিয়েছে। নির্মাণ সামগ্রীর দাম, জমির অভাব এবং রেজিস্ট্রেশন ফি বাড়ার কারণে ফ্ল্যাটের দাম গত কয়েক বছরে ২০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। উত্তরায় প্রতি বর্গফুট ফ্ল্যাটের দাম এখন সাড়ে ৭ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা, মিরপুরে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা। নতুন ফ্ল্যাট তো দূরের কথা, উচ্চ রেজিস্ট্রেশন খরচ ও ব্যাংক ঋণের চড়া সুদের কারণে পুরনো ফ্ল্যাট কেনাও অনেকের সাধ্যের বাইরে। ঢাকার আবাসন বাজার ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে কেবল উচ্চবিত্ত বা কালো টাকার মালিকদের দখলে।

গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির বিল যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। এলপিজি সিলিন্ডারের দাম সরকার ১,২৫৩ টাকা নির্ধারণ করলেও ভোক্তাকে কিনতে হচ্ছে ১৪০০-১৫০০ টাকায়। বিদ্যুতের দাম বেড়েছে দফায় দফায়। ‘ক্যাপাসিটি পেমেন্ট’-এর বোঝা চাপানো হচ্ছে জনগণের কাঁধে। আর ওয়াসার পানির মান নিয়ে হাজারো অভিযোগ থাকলেও দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা চলছে নিয়মিত।

২০২৫ শিক্ষাবর্ষের শুরুতে ঢাকার নামি বেসরকারি স্কুলগুলো টিউশন ফি ১১% থেকে ১০০% পর্যন্ত বাড়িয়েছে। ‘উন্নয়ন ফি’, ‘সেশন চার্জ’-এর নামে অভিভাবকদের পকেট কাটা হচ্ছে। ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে মাসিক বেতন ১৫ থেকে ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত। বাংলা মাধ্যমের নামি স্কুলগুলোতেও খরচ আকাশছোঁয়া। একজন অভিভাবক, যিনি সরকারি বা বেসরকারি চাকরিজীবী, দুই সন্তানের স্কুলের বেতন আর কোচিং ফি মেটাতে গিয়ে নিজের চিকিৎসা বা বিনোদনের খরচ বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছেন।


বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৩ শতাংশই রোগীকে নিজের পকেট থেকে দিতে হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। সরকারি হাসপাতালে শয্যা সংকট আর দালালদের দৌরাত্ম্যে মধ্যবিত্তরা বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালের দ্বারস্থ হন। সেখানে প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার ফি-র কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। ওষুধের দাম গত এক বছরে ২০-৩০% বেড়েছে। বিআইডিএস-এর গবেষণা বলছে, প্রতি বছর চিকিৎসার অতিরিক্ত ব্যয়ের ভারে প্রায় ৬.১৩ মিলিয়ন মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। একটি বড় অসুখ-ক্যান্সার বা কিডনি রোগ-একটি স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত পরিবারকে রাতারাতি পথে বসিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

মধ্যবিত্তের সংকট কেবল ব্যয়বৃদ্ধিতে নয়, সংকটের মূল প্রোথিত আয়ের স্থবিরতায়। গত চার বছর ধরে মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির নিচে। ফলে মানুষের ‘ক্রয়ক্ষমতা’কমে গেছে। একজন চাকুরিজীবী গত বছর যে বেতন পেতেন, এ বছর হয়তো নামমাত্র বেড়েছে, কিন্তু বাজারে পণ্যের দাম বেড়েছে কয়েকগুণ।

বাঙালি মধ্যবিত্তের বিপদের বন্ধু ছিল ‘সঞ্চয়পত্র’বা ব্যাংকের এফডিআর। কিন্তু উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষ এখন আর সঞ্চয় করতে পারছে না; উল্টো জমানো টাকা ভেঙে খাচ্ছে। সঞ্চয়পত্র বিক্রির হার ৮৮% কমে যাওয়া অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত। সংসার চালাতে অনেকে ক্রেডিট কার্ডের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন, জড়িয়ে পড়ছেন দীর্ঘমেয়াদী ঋণের ফাঁদে।

খরচ কমাতে মধ্যবিত্তরা বাধ্য হয়ে জীবনযাত্রার মানে আপস করছেন। মাছ-মাংসের বদলে ডাল-ভর্তায় অভ্যস্ত হচ্ছেন। টিসিবির ট্রাকের পেছনে ভদ্রলোকদের লাইন দীর্ঘ হচ্ছে। ভালো বাসা ছেড়ে কম ভাড়ার ছোট বাসায় উঠছেন। আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন খরচের ভয়ে। এই ক্রমাগত সংগ্রাম ধ্বংস করে দিচ্ছে মানসিক স্বাস্থ্য। পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি সর্বদা ভুগছেন উদ্বেগ আর হতাশায়। সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হওয়ার ভয়ে তারা কষ্টের কথা কাউকে বলতেও পারেন না।

বাজারের এই অস্থিতিশীলতার জন্য বৈশ্বিক কারণের চেয়ে অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা বেশি দায়ী। ‘সিন্ডিকেট’ শব্দটি এখন বাংলাদেশের অর্থনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। ভোজ্যতেল, চিনি, ডিম ও আলুর বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে গুটিকয়েক বড় ব্যবসায়ী। তারা যোগসাজশ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযান চালায়, জরিমানা করে; কিন্তু তাদের জনবল ও আইনি ক্ষমতা সীমিত। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিচার বিভাগ ও ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা আনার চেষ্টা করলেও বাজার ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে পারছে না। চাঁদাবাজি-যা আগে রাজনৈতিক দলের নামে হতো-এখন কেবল হাতবদল হয়েছে, কিন্তু বন্ধ হয়নি। পরিবহনে চাঁদাবাজি বহাল থাকায় পণ্যের দাম কমছে না।

ঢাকা শহরের মধ্যবিত্তশ্রেণি আজ এক গভীর অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। আয়ের সাথে ব্যয়ের যোজন যোজন দূরত্ব তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকারগুলো আজ পণ্যে পরিণত হয়েছে, যা কেবল বিত্তবানদের জন্য সহজলভ্য। মধ্যবিত্তের সঞ্চয় ফুরিয়ে গেছে, স্বপ্ন ফিকে হয়ে গেছে। এই ‘নীরব সংকট’ থেকে উত্তরণের জন্য আশু পদক্ষেপ প্রয়োজন- সরবরাহ চেইনে সংস্কার : কৃষকের কাছ থেকে পণ্য সরাসরি ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি বন্ধে নিতে হবে কঠোর ব্যবস্থা। কঠোর বাজার মনিটরিং : কেবল খুচরা বাজারে নয়, উৎপাদনকারী ও আমদানিকারক পর্যায়ে মনিটরিং জোরদার করতে হবে। প্রতিযোগিতা কমিশনকে কার্যকর করে ভাঙতে হবে সিন্ডিকেট।
সামাজিক নিরাপত্তা : ওএমএস কার্যক্রম ও টিসিবির ফ্যামিলি কার্ডের আওতা বাড়িয়ে নিম্ন-মধ্যবিত্তদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
আবাসন ও চিকিৎসা নীতি : বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন ও বেসরকারি হাসপাতালের ফি নিয়ন্ত্রণে রেগুলেটরি বডি গঠন করতে হবে।
আয় বৃদ্ধি : মুদ্রাস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে বেতন কাঠামো পুনর্নির্ধারণ করা এখন সময়ের দাবি।

পরিশেষে বলা যায়, ঢাকা শহরকে বাসযোগ্য রাখতে হলে এবং অর্থনীতির মেরুদণ্ড মধ্যবিত্তশ্রেণিকে বাঁচাতে হলে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প নেই। অন্যথায়, স্বপ্নের এই শহর অচিরেই পরিণত হবে কেবল ইট-পাথরের জঞ্জাল আর হতাশ মানুষের দীর্ঘশ্বাসের শহরে।