
একজন সাধারণ মা থেকে শহীদ জননী হয়ে ওঠার দিনলিপি জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’। বইটিতে ১৯৭১ সালের ১লা মার্চ থেকে শুরু করে ১৭ই ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৬৮দিনের রুদ্ধশ্বাস বয়ানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম, বর্বর নির্যাতন এবং হত্যাকান্ডের চিত্র ফুটে উঠেছে। এই বইয়ের তৎকালীন জীবন্ত প্রধান চরিত্র লেখিকাসহ রুমী, জামী, শরীফ, কিটি, লেখিকার শ্বশুর, সুবহান, বাকের সহ আরও অনেকে। যার মাধ্যমে লেখিকার সহযাত্রী, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন, ছেলেদের আর স্বামীর বন্ধুবান্ধবকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বিশেষ করে ঢাকা শহরের বাস্তবচিত্র উঠে এসেছে। আরও উঠে এসেছে যুদ্ধ সময়ে হতাশা আর হাহাকারের বিপরীতে বেঁচেথাকার সংগ্রাম, অন্যদের বাঁচিয়ে রাখার প্রচেষ্টা। সেই দুঃসময়ে পারিবারিক উৎসব, আড্ডা আর প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা সামলে নেওয়া সহ প্রাত্যাহিক জীবনের নানাবিধ ঘটনাবলী।
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বইটিতে প্রাসাঙ্গিক ভাবে নানাবিধ আলোচনা উঠে এলেও মূল থিম হিসেবে মাতৃত্বই প্রাধান্য পেয়েছে। ৭-ই মার্চ রেডিওর চুপ করে থাকা আর শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া না দেওয়া নিয়ে একান্ত পারিবারিক তর্ক-আড্ডা। আবার ১৭-ই মার্চ পত্রিকা হাতে মায়ের সাথে রুমির রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং দুরদর্শিতাপূর্ণ কথাবার্তা। আলাপ চলাকালীনই তাদের বাসায় আগমন ঘটে অ্যাস্ট্রলজার অজিত নিয়োগীর। মাতৃহৃদয় সম্ভবত অনেককিছুই পূর্বে আচ করতে পারে। ওইদিন তিনি নিয়োগী সাহেবকে দুটো প্রশ্ন করেন, “এক নম্বর প্রশ্ন — দেশে রক্তস্রোত বয়ে যাবার সম্ভবনা আছে কি না। দুই নম্বর প্রশ্ন—আমার কপালে পুত্রশোক আছে কি না।” বড় ছেলে রুমির যুদ্ধ রাশির কথা বলে ওকে সাবধানে রাখবার পরামর্শের বিপরীতে জানাহারা ইমাম উত্তর দেন, “ওসব সাবধানে রাখার কথা বাদ দিন। আমার কপালে পুত্রশোক আছে কিনা তাই বলুন। ওটা থাকলে লখিন্দরের লোহার ঘর বানিয়েও লাভ নেই।”
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ছোট-বড় প্রায় ঘটনাই দিন অনুযায়ী অত্যান্ত গুরুত্বের সাথে উঠে এসেছে জাহানারা ইমামের দিনলিপিতে। যুদ্ধের শুরু থেকেই অত্যাচারী শাসকদের প্রতি ঘৃণা অনুভব করত রুমী। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ঢাকাকে এই ভয়ানক তান্ডবলীলায় বিপর্যস্ত হতে দেখে সে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারছিল না। প্রায় প্রতিদিনেই মায়ের সাথে দুই ভাইয়ের যুদ্ধে যাওয়া নিয়ে তর্ক হত। এর মধ্যেই রুমীর আমেরিকার ইলিনয় ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজিতে স্কলারশিপ হয়ে যায়। কিন্তু স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে পড়তে যাওয়া নয়, সেসময় তার চোখে ছিল দেশকে স্বাধীন করার স্বপ্ন। যুদ্ধ যাওয়ার সুযোগ এলে মায়ের কাছে অনুমতি চায় সে। লুকিয়ে পালিয়ে কিছু না করবার শিক্ষা দেওয়ায় নিজের ফাঁদে নিজেই পরে যান মা। কারণ রুমি তার অনুমতি ছাড়া লুকিয়ে-চুরিয়ে কিছু করবার ছেলে নয়। কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিতর্ক প্রতিযোগীতার উজ্জ্বল তারকা রুমীর যুক্তির কাছে হেরে যান মা। ২১শে এপ্রিল বুধবার ১৯৭১, মাকে জীবনের সবথেকে কঠিন সিদ্ধান্তটি নিতে হয়েছিল। তাকে অনুমতি দেওয়ার সময় মা সবথেকে চমৎকার এবং বেদনাদায়ক কথাটি বলেছিলেন, “ঠিক আছে, তোর কথাই মেনে নিলাম। দিলাম তোকে দেশের জন্য কোরবানি করে। যা, তুই যুদ্ধে যা”।
রুমী ট্রেনিং নিয়ে ২নং সেক্টরে যোগ দেয়। এরপর শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের বর্ণনা। যুদ্ধের ফাঁকে সে বাড়ীতে আসে, যুদ্ধের গল্প শোনায়। যে রুমী গ্লাসে একটু ময়লা দেখলে পানি খেত না, সে যুদ্ধে গিয়ে পোকা খাওয়া রুটি খেত। এসব শুনে অশ্রুসিক্ত হত মা। আগস্টের শেষের দিকে অসর্তর্কতা বসত রুমী এবং তার সহযোদ্ধারা ধরা পড়েন। শরীফ এবং জামীকেও তুলে নিয়ে যাওয়া হলেও তারা পরেরদিন ছাড়া পায়। মার্সি পিটিশন করলে হয়তো রুমীকে ছাড়ানো সম্ভব ছিল। কিন্তু ছেলের আত্নসম্মানের দিকে তাকিয়ে খুব কঠিনভাবে ধৈর্য্য ধরেন। ৫-ই সেপ্টেম্বরের দিনলিপিতে উঠে এসেছে দ্বিধাদ্বন্দ্ব পূর্ণ সেই সংকটকালের কথা। শেষপর্যন্ত যে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে রুমী মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছে সেই সামরিক সরকারের কাছে দয়াভিক্ষা না করবার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন লেখিকা এবং তার স্বামী শরীফ। আজাদের মায়ের বর্ননাও রয়েছে এই দিনলিপিতে। যুদ্ধের শেষের দিকে স্বামীকে হারিয়েও শক্ত থেকে সহ্য শক্তির পরিচয় দেন তিনি। অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের নিজের সন্তান ভেবে সাহায্য পাঠাতে থাকেন। জাহানারা ইমাম হয়ে ওঠেন সকল মুক্তিযোদ্ধার মাতা। পরবর্তীতে আখ্যা পান শহীদ জননী হিসেবে। ১৬-ই ডিসেম্বর পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের পর ১৭ ডিসেম্বর রুমীর বন্ধুরা আসেন জননীর সাথে সাক্ষাৎ করতে। জামীর অস্থিরতা আর লেখিকার আত্মানুভূতি মিলে এক হৃদয়গ্রাহী মুহূর্ত সৃষ্টি হয়।
বইটির মাধ্যমে এক মুক্তিযোদ্ধার মাতা, এক সংগ্রামী দেশ প্রেমিকের স্ত্রী, এক দৃঢ়চেতা বাঙালী নারী -বুকচেরা আর্তনাদ নয়, শোক বিহ্বল ফরিয়াদ নয় তিনি গোলাপকুঁড়ির মতো মেলে ধরেছেন যুদ্ধকালীন আপনকার নিভৃততম দুঃখ অনুভূতি। উদ্দীপনা, সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, বেদনা, মাহাত্ম্য আর দেশপ্রেমের সম্মিলনে বইটি নিছক দিনলিপি নয়, এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দলিল। যেটি তিনি উৎসর্গ করেছেন “মুক্তিযুদ্ধের সকল শহীদ ও গেরিলাদের উদ্দেশ্য”।
