মোস্তফা মোহাম্মদের একগুচ্ছ কবিতা

গজগামিনী

রাধা বেশে এলোচুলে আলুথালু পায়,
এলে বুঝি গজের দেবী নীল যমুনায়;
সোমত্ত এক গোপবালা চৌধুরী নন্দিনী,
পায়ে হেঁটে এলে তুমি গজের গামিনী;
তোমায় আমি দেখি সোনা দূরবহুদূর,
বুকে আমার বজাও বাঁশি বেদনাবিধুর;

রক্তগোলাপ

রক্তগোলাপ তুমি,
ফুটে আছো হরিতলার মাঠ,
নির্ঘুম রাতের আকাশ--
নিরবতাভাঙা পাখি প্রাণেশ্বরী আমার;
যায় দিন,
যায় চলে যায়--
আমাদের হয়নিকো দেখা কোনোদিন,
মিছিলে যাবার আগে ক্লান্ত শরীর,
উদাস প্রান্তরের গান সুখ-প্রদায়িনী;
ঘড়ির দিকে তাকাই,
আমার শখের হাতঘড়ি--
নিজেকেই দেখি,
খুঁজে পাই তোমাকেও ভালোসার শুকপাখী!
একটা পাখি উড়ে যায়,
ছায়া তার ঝুলে থাকে শূন্যের উপর,
আমার হাতঘড়ির কাঁটার মতোন,
নিঃশব্দ একাকী ঘুরে ঘুরে ভালোবাসার কথা কয়;
'ভালোভাসি' শব্দটায় দোল খায়,
হাতঘড়ির কাঁটায় সুদীর্ঘ ছয়টি বছর;

সাদা-কালো

খবর নিও সবিশেষ,
তুমি অনাবৃষ্টি হলে আমি পুড়ে যাই,
তীব্র খরায় উজাই নদীর বুক,
চিরন্তনী বাংলার আমি বানভাসি শুশুক;
নীলাঞ্জনা আছো তো বেশ!
বৃষ্টিভেজা চিবুক আমার নদীমেখলা দেশ;
তুমি পালটে দাও সময়ের ঘড়ি,
বিল-জলা-হাওর বাউরি,
দখিনা বাতাসের অর্বাচীন উতরোল--
তোমার বিশুষ্ক পাতারা রঙ বদলায়,
সাদাশাড়ি-না-কালো--ঠাহর করাই দায়!?

বদলে যাও,
দিন বদলের রেশ,
শীতের কুয়াসা পড়ার আগেই,
কালোয় ঢাকা কেশ!

বদলে দাও,
বেবাক কালোর দ্বেষ,
আলো জ্বালাও, জ্বলুক আলো,
তীব্র অনিঃশেষ!
আমার প্রিয় স্বদেশ তুমি আমার সোনার বাংলাদেশ;

কফির পেয়ালা

হেমন্ত চলে গেছে কবে,
সেই তুমি চলে যাও আগে আর পর,
তিক্তরিক্ত ফসলের মাঠ--
দূরাভিলাষী দাঁড়িয়ে থাকা আমার,
বেড়ে গেছে উৎপাত শালিক আর পেঁচার;
আনাগোনা মানেনা মানা,
কাঁচিকাটা ধানের আর নাড়ার--
মহুয়া-মাতাল গন্ধ পাচ্ছি শতভাগ,
আজও ওই দূরবর্তী প্যাঁচার দ্বীপের আলিঙ্গন;
দূর কোনো দূরই নয়,
যদি ঘুড়ির সুতা মাজা হয়--
কেটে যায় রাত আর দিনের ফারাক,
বসন্ত আসবে বলে বিদায়ী হেমন্তের অভিলাষ,
হলুদ বসন্ত ওরে রাতজাগা পেঁচা,
অন্ধকারে বুকের ভেতর হলুদ বসন্ত আমার;

খুনির চোখে হারানা চুরুট

ভালোবাসা যতোটা সহজ,
খুন করা ততোটা সহজ নয় লক্ষ্মী-সোনা!
বুলেট আর চুম্বনের বিস্তর ব্যবধান--
ভুলে থাকায় আর ভুলে যাওয়ায়,
মিয়ামির দূরত্ব ভুলে গেছো মারিতা লরেঞ্জ!
ফুটন্ত কফির মগ,
ঘরময় হাভানা চুরুটের ধোঁয়ায়--
কেটে গেছে তোমার খুনের নেশা,
হায় ঈশ্বর! এই কী নিয়তি--
ফিদেল ক্যাস্ট্রোর ঠোঁটে মারিতা লরেঞ্জের আমারিকান বুলেট;
আমার মৃত্যু নিশ্চিত করার পর,
অপেক্ষায় থাকা ফ্লাইটে মিয়ামিতে ফিরে যাবে তুমি!
হরিণ-নয়না মারিতা লরেঞ্জ?
প্রিয়তমা আমার--তুমি যেতে পারো নাই;
আমার দেওয়া ৪৫ বোরের লোডেড পিস্তল,
পকেটে লুকানো জীবননাশী বটুলিজম ট্যাবলেট,
হোটেলের নিচে অপেক্ষায় থাকা সিআই'র বাঘা-বাঘা এজেন্ট,
তুমি গুলি চালাবে বলে আমি বুক পেতে দাঁড়াই;
তোমার চোখে চোখ,
ঠোঁটে ঠোঁট রেখে জড়িয়ে ধরেছি বহুবার,
উনিশ বছরের কিশোরী তুমি,
তেমার বুকে খেদাই করেছিলাম ব…

প্রেমিকের মন

তোমাকে দেখলেই ভরে যায় মন,
বিকেলের সেই মেয়ে প্রেমিক-প্রবণ;
গান গায় পাখি জানো আরও কী?
সেই তুমি প্রাণপাখি,
পাতা ঝরা গাঁয়--
পুকুড়ের পাড় আর খালের দিশায়;
কিছুটা হাঁটাহাঁটি বাকিটা নৌকায়,
যায় তরী ভেসে যায় স্রোতের মেঘনায়;
বনলতা কত কথা নাটোরের রাণী,
মাথা-মুণ্ডু-ছাই কবিদের পাগলামি!
নাটোর তলিয়ে আছে কাঁচাগোল্লায়,
আমার ঐশীকথন ভোল পালটায়;
ইছামতী জানো তাকি নাকের নোলক,
করতোয়ার স্বচ্ছতোয়া পুণ্ড্রর ঝলক;

স্বপ্নযাপন

তোমাকে কাছে পাওয়ার স্বপ্ন,
আর দুঃস্বপ্নের রাত--
গোলকপিণ্ড চুম্বনের সাফল্যগাথা নয়,
রাতের অন্ধকারে কেঁপে-ওঠা বিভাজনের দেওয়াল,
জাগতিক ভূমিধ্বস-ভূমিকম্প অথবা পূর্ণিমার চাঁদ;
দখলবাজ নই আমি,
প্রেমের বারুদে হৃদয় রক্তাক্ত করা ছাড়া খুব বেশি কী চাওয়া আমার!
রাতের বাসরের চেয়েও অধিক--
তুমিই বলো: একাকী নির্জন দুপুর!?
ভালোবাসার কোনোই মূল্য নাই--মুঠোভরা রোদ্দুর;
আমি এক নির্লজ্জ প্রেমিক তাই,
তোমার নিমীলিত চোখ--
লজ্জাবতী ওভাবে আড়াল করছো কেন?
বুককাঁপা নিক্কণ-নূপুর আর পূর্ণাঙ্গ চাঁদ তোমার;
দ্বার খুলে দাও,
লাফাও আমার বুকের উপর,
সাত-সমুদ্দুর অথবা পাহাড়-নদী-গাঁও,
দাও পাও, আমার বুকের উপর তোমার সোনার পাও!

কিছু কথা

ডুবন্ত তুমি,
জলেভাজা সূর্যের মতো,
দিন নাই, রাত নাই--
ইদানিং তুমি যখন-তখন,
আমার মাথার মধ্যে ঢুকে পড়ো;
ফোনের বোতাম টিপলেই,
বাদামী স্তনের বোটায় মুখ লুকাও,
মিথ্যার ফুলঝুরি সাজাও,
আমার চোখের পাতায়--
বুকের ভিতর ঘরের বাইরের চর-তুফানিয়া;
ব্যথা নয়, সুখ নাই,
চোখের দুঃখের সাগর তাই,
ব্যাখ্যাতীত একটা অদ্ভুত টান তোমার উপর;
তৃষ্ণার্ত আমি,
প্রতীক্ষার প্রাহরিক চাতকিনী তুমি,
নিভন্ত চিতায় ঘন্টার পর ঘন্টা--
দিনের পর দিন,
রাতের চেয়েও অধিক,
জেগে থাকা ডাহুক অদৃশ্য অপেক্ষা আমার;
জানি তুমি এক নিষিদ্ধ গন্ধম,
খাওয়াটা আমার জন্য হারাম বরাবর;
মানবিক সম্পর্ক তাই,
কিছু নাই, তবুও আছো--
নাই কোনো নাম,
নাই কোনো অধিকার,
আছে শুধু নির্লজ্জ কাঙালিপনা আমার;