অমরণী ফুল ও কেরুং ফলের গল্প

কার সাথে কথা কয়


সুদিনের বেইল-ঠিক-দুপুর। ঝাঁঝাঁ রোদের দিকে চোখ ঘোলা করে তাকিয়ে আছে সফুরা। অই দূরে দেখা যাচ্ছে তার মরদটা মূরা বেয়ে নামছে, আলু-ক্ষেতির বেড়া নাড়ছে ছাগলটা, এক ঝাঁইর কাঁটা-মারিশ শাক নিয়ে ঘুরছে ঘষা-মাজা চেহরার একটা মেয়ে, দুয়ার লেপা মাটি থেকে গোবরের ঘ্রাণ আসছে, ছাড়াছাড়া সবুজ ঘাসে অনেকদূর পর্যন্ত চলে গেছে জমিন ধরে মাটির আইল, আরো কত কী কী সব একচোখে অপলক তাকিয়ে আছে সফুরা। তার ঘোলা চোখ।
ঐ কোন না-দিকে তাকিয়ে থাকা সফুরার দৃষ্টি ধরে, মনে হওয়া ঘাসের, জামিনের, আইলের পথ ধরে, উঠানে এসে দাঁড়ায় মমিন। মূরা থেকে বয়ে আনা গাছের কচির গোছা নামাতে নামাতে যখন গজগজি মেরে কিঁয়ায় উঠে মরদটা, সফুরার বুক ধ্বক করে উঠে। তাড়াতাড়ি দিয়ালা থেকে নেমে মমিনের হাত ধরে। ঘরে তুলে ধরে ধরে। কপালে হাত রাখে। জ্বর মাপে। মমিনের পায়ের তালু তুলে দেখে, ফাটা-তজ্জাতজ্জা গোড়ালির নিচে আস্ত গাছের টুকরা ঢুকে গিয়ে দেবে গেছে অনেকটা।


এই কারনে কেউ পাগল হবার নজির নেই লোকাল ইতিহাসে, তাই কেউ কেউ অবাক হয়। যদিও পায়ের দরদে পাগল হতেও পারে মানুষ। পায়ের তালুর রগগুলো ঐ মাথার সাথেই বিঁধে আছে বেশি। কিন্তু মমিনের মাথায় দোষ দেখা যাওয়ার অনুমান কারও কারও মনে আসে এই কারনে যে, পায়ে গাছের ফালা ঢুকার পর থেকে বাতাসের সাথে কথা বলার প্রবণতা ও পরিমাণ দুটোই বেড়ে গেছে তার। হামেশ-ক্ষণ নিজে নিজে গজগজ করে গোসসায় ফেটে পড়ছে।
বেইল-ঠিক-দুপুর থেকে বসে আছে মমিন, বড় বাজারের ফার্মেসির কাম্পাওন্ডারের আন্ডারে কম্পাওন্ডারগিরি শিখে লোকাল মানুষের মুখে মুখে ফেটে পড়া ডাক্তার আমির হামজা, প্রকাশ আইরঞ্জা ডাক্তরের অষুধের দোকানে। কিন্তু বেইল পড়ে গেছে পশ্চিমকূলে মুক্তার-হাজীর সুপারি বাগানের মাথায়, এখনো আইরঞ্জার আসার নিশান পর্যন্ত চোখে পড়ছে না। পায়ের-মুরির টনটনানি নিয়ে দাঁতে দাঁত কষে খিছ মেরে বসে থাকে মমিন নিঝাপ-নিরালায়।


কিন্তু কারও কারও মনে ঐ অনুমান সন্দেহে রূপান্তরিত হতে টাইম লাগে না। যখন তারা দেখে আইরঞ্জা ডাক্তর আসার পর সে যখন তার চতুর চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নাক-মুখ কুঁচকে মমিনের পায়ের পাতার গোড়া খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকে। আর গুরুগম্ভীর টোনে একটার পর একটা সাওয়াল করে যায়- কী গাছের ফলা, কীভাবে ঢুকলো, দিনে খুঁট মারে বেশি না রাইতে -এইসব বেহুদা। আর মমিন বেকুব ব’নে চেয়ে থাকে।
এবং একে একে নিচের পাতা নামিয়ে চোখ, লম্বা করে বের করে জবান, তলপেটে চাপ দিয়ে আঁতি, স্টেথোস্কোপ দিয়ে বিমার-হার্টবিট, কব্জি চেপে মমিনের নাড়ি পরখ করে আইরঞ্জা। পরে এক পাতা প্যারাসিটামল ও ফলা ঢুকে যাওয়া পা-টা কয়দিন ঝুলিয়ে হাঁটার মহামূল্য পরামর্শটা দিয়ে বিদায় করে দেয়। তাজ্জব হয়ে কিছুক্ষণ নিরুদ্দেশ তাকিয়ে থাকতে থাকতে মমিন লুংগির গোছ হাতড়ে বের করতে থাকে ডাক্তারের ফীস।
তারপর নিজেকে নিজেই গজগজি মেরে বলে উঠে- হাঃ, চুদানির গা হাঃ, আজিয়াও একশ তোর ফেড়ত দিলাম, হাঃ।
এভাবে নিজেনিজে গজগজ করতে করতে মমিন যখন চলে যেতে থাকে, উপস্থিত সকলের চোখে বিষ্ময়, কার উপর রাগ ঝাড়ে মমিন, কার সাথে কথা কয়?

ঋতু

একটা জানালার পাশে সারাটা দুপুর দাঁড়িয়ে থেকে দেখেছি- বৃষ্টি, ভিজা রাস্তা, দোকানের শ্যাডেশ্যাডে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনের ভীড়, অনেকদূরে- যেখানে বৃষ্টি হচ্ছে আরও জোরে সেখানের আকাশ ধুসর-অন্ধকার।
দুইজন লোক একে অন্যকে এবনর্মাল বলতে বলতে রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলে গেল। একজন- তুই এবনরমাল দে, অন্যজন- তুই ডবল এবনরমাল…এভাবে, হাত নেড়ে নেড়ে। মানুষের জীবন টানছে খুব। একটা মিহি সুতারও টেনে নেবার প্রচুর দৃঢ়তা থাকে নিশ্চয়ই।
একটা বারো-তের বছরের মেয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ঢুকে পড়লো চিকন-মতো গলিতে। টিনের-চালা ঝুপড়ি থেকে বের হয়ে এসে মেয়েটির মা চ্যানচ্যানায় উঠলো ওকে দেখে; অই, হাংকি, মাগী…গা-ত তেল অইয়্যেদে নে! শুনে, মেয়েটা হাসছে। ওর মা ছুটে এসে জোরে একটা ধাক্কা দিল মাথায়। মেয়েটা নালায় পড়ে গেছে, পড়ে পড়ে হাসছে। বৃষ্টি বেড়ে গেল। মেয়েটা উঠে দৌঁড় দিলো ভরা-পুকুরটা পেরিয়ে বিলের আইল ধরে। মেয়েটার মা পেছন থেকে ডাক-মারে, অ-অ-ই মাবিয়ানী, হড়ে য’রগই এন্ ঝরে-বানে?
শাক ফেঁড়াইতোওও… ব’লে মেয়েটা বৃষ্টির ছাটের আর্গলে ঢুকে গেলে, তার গলার স্বরও ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় টিনের চালের উপর নেমে আসা ঝুম বৃষ্টির ফোটার বাদ্য-বাজনার তলে।
আমার মন তুলে আনে অন্য এক চিত্র তখন, গতকাল রাতে সারাদিনের বৃষ্টির পানিতে বেশিরভাগ ভিজে যাওয়া লিপসা-কলোনির বিল্ডিংয়ের ছাদের শুকনো একচিলতে ভাগে প্লাস্টিকের একটা পাটি বিছিয়ে ঝকঝকে চাঁদের আলোমাখা আকাশ আর হু-হু বাতাসের মাঝে চিৎ-সাঁতারের ভঙ্গিতে ভাসিয়ে দিয়ে নিজেকে দেখছিলাম, কিছু তারা নিয়ে একটা চাঁদ আমাদের দৃষ্টিকোণে গেঁথে যাওয়া একটা আকাশ- একটা নিউজপ্রিন্ট কালারের ক্যানভাসে আঁকা জলচিত্র সমেত আকাশ- সাথে করে বেশ ধীরে ঘুরে গেল পূর্ব থেকে পশ্চিমে। এভাবে দেখতে দেখতে মধ্যরাতে গিয়ে পৌঁছালে ঘড়ি, বেসুৎ সময়ে বেঝে যাওয়া চোখ ও চোখের দূরবীন-মন ফেলে রেখে আমরা যখন ঘরে ফিরছিলাম মাবিয়ার অদৃশ্য হয়ে যাবার ঐ একই পথে, তখন আমার মনে মনে কে যেন বলছিল, একটা ইঁদুর, হিপনোটাইজড একটা ইঁদুর যদি চলে যায় বিড়ালের গোল থাবার ছায়ারেখাগুলো ধরে, তার ফেরার কোন আশা আছে?
এরপরে, আরও এক গল্প মন খুঁজে আনে স্মৃতি থেকে, মেঘের সাথে কথা বলতে গিয়ে নাকি এক বালিকা হারিয়ে গেছে ঐ দূরের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ে, আজও ফেরেনি। সেই মেয়েই এককালে ভাবতো- মেঘ সম্পর্কে -অদূরে কোথাও কোন ঘরে অনেক কাপড় ধোয়া হচ্ছে, এই মেঘগুলো হল কাপড় ধোয়ার সেই ডিটার্জেন্টের ফেনা, ততদিনই, যখন না আবার সেই মেঘ হয়ে উঠে কালিদাসের দূত তার কাছে।
তাকে হারিয়ে ফেলা উপত্যকাবাসীরা বলে, সত্যি মেয়েটা সেদিন উঠেছিল অই পাহাড়চূড়ায় এবং কস্মিনকালেও তার আর দেখা মেলেনি। সে গিয়েছিল তার মনের খোঁজ নিতে মেঘদূতের কাছে এবং দেখতেদেখতে শাদা মেঘের এক বিরাট বহর তাকে নিয়ে গেছে তার মনের কাছে। অনেকদিন হল তার ফেরার আশা তারা ছেড়ে দিয়েছে।- এমন আজগুবি আর বিচিত্র ভাবনার ফাঁকে বৃষ্টি কিছুটা কমে আসে।
চারদিক ফর্সা হয়ে আসছে। টিনের চালের একটানা ঝমঝমানি শব্দ কমে আসছে এবং সেই লো-হয়ে-আসা ধ্বনির উপর চড়ে বসছে দূর হতে, সম্ভবত বিলের দিক থেকে, একটা মেয়ে-গলার সাউণ্ড। ও-ও মা-রে, ও-ও মা-রে…। শব্দটা কাছে আসতে আসতে চিৎকারে রূপ নিলে, কলোনির বিভিন্ন ঘর থেকে একটা দুইটা করে মানুষ বের হয়ে আসতে থাকে, এবং একসময় মেয়েটার মা-ও চিলবিল-খেয়ে যখন বের হয়ে এলো, সকলের সাথে সাথে সেও দেখতে পেলো, মাবিয়াই ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে কেঁদে দৌঁড়ে আসছে বিলের সবুজ মাড়িয়ে। তার বৃষ্টিভেজা ফ্রক আর শাদা সেলোয়ার রক্তে লাল হয়ে আছে।
মাবিয়া দৌঁড়ে এসে মায়ের বুকে ঝাপ মেরে আছড়ে পড়তে পড়তে ব’লে- অ’মা অ’মা রক্ত!
মাবিয়াকে নিয়ে তার মা ঝুপড়িতে ঢুকে গেলে, অন্যরাও নিজ নিজ ঘরে ফিরে যেতে থাকে। যেতে যেতে কলোনির দুইজন মহিলা ফিক্-ফিক্ করে হেসে একে অন্যের গায়ে ডলাডলি করতে করতে বলছে, ইন্ কিছু ন, ইতারো মায়োফোয়া ইবা ডঁ-র অইয়্যেদে। ফইল্লা-বার মাসিক’র রক্ত দেহি ডঁরাইয়্যেদে এরী।।

সঞ্জয় ও লাবণ্যময় লাবনীর-চর


সঞ্জয় শুনে যাচ্ছে আরও একটা সঞ্জয় দূরভাঙ্গা ইথারের কণ্ঠে বাইছে মনোজ্ঞ গীতী-নৌ। আমি যেন জলচূড়া ভেঙ্গে ছিটকে আসা একফোঁটা ঢেউ, যার ভারে হঠাৎ দোলে উঠে পা-কয়েক ধরে গড়া সে গীতের লিরিক। সঞ্জয় এবার ভালমতো তাকায় আমার দিকে। ভেঙ্গে নিজবিম্ব যখন সে অবমুক্ত করলো আমাকে গোধুলির জাদুবাস্তব লাবন্যতা সরিয়ে, তখন লাবনীর চর মানুষেমানুষে গমগম। মানুষের গায়ের গুঞ্জন ভেদ করে আমি আর সঞ্জয় হেঁটে যাই বধীর এবং কিছুটা অধীর।
আমাদের অব্যবহিত গন্তব্য গল্প আর গোধুলি। আরো আগে বালুর দানার মনোহর আলপনা সাজিয়ে রেখে সন্তর্পণে সরে গেছে লাললাল কাঁকড়ারদল, পশ্চিমের আকাশ সেজেছে রাক্ষস-রক্তাভ, খেয়ে যাচ্ছে সমানে সবার চোখ-মুখ, তাকিয়েছে যারা তার দিকে একবার বিষ্ময়ে, বেকুব হয়ে! এভাবেই তারা হারিয়ে ফেলেছিল তাদের মুখ ও মুখোশ। আমাদের মুখোশ আমরা রেখে এসেছি সাজঘরে, এখন শুধু মেলে ধরেছি মুখ কথার ধুনে। কথাই নিঙড়ে নিচ্ছে আমাদের যত ব্যথা আর যত ব্যার্থতা, আমাদের টেনে নিয়ে চলছে তো চলছেই বিদ্যুৎ-বিভোর।
‌বালুচরে এঁকে স্বর্ণরেখা রচনা করা হয়েছে ব্যুহ, পরিব্যাপ্ত অগ্নিকে ঘিরে জনতার বুকে জাগরুক জয়োল্লাস, হলকাবন্দী দমকা চুল উড়ছে কারো কারো, যেন উড়াচ্ছে শীষ শীশমহলের চূড়ায় উঠে একঝাঁক হাওয়া। রাশিরাশি ঝাউপাতাই ঐ বাতাসের বাঁশি। ওখানে কিছুক্ষণ দাঁড়াই আমি আর সঞ্জয়। আমরা নির্দিষ্ট কোন বিষয়ে কথা বলছিলাম না, তাই হয়ত আমাদের গল্পে পরিবেশ পরিচিতিই বেশি। আমরা কথা শুরু করেছিলাম মুক্তির প্রসঙ্গ দিয়ে, তারপর আমাদের কথা ছুটে গেছে বেলাভূমির উপর দিয়ে, সমুদ্রের নীল জলের উপর দিয়ে অক্লান্ত, যতক্ষণ না কথার রসে সূর্য ডুবে গেলো।
শুধুমাত্র সবচেয়ে উঁচুতে উঠতে পারা ঢেউগুলোই আমাদের কথার বহরে মাথা ছোঁয়াতে পেরেছিল, এরপর তারা এমনভাবে আছড়ে পড়ছিল যেন আমরা যা কিছু বলে যাচ্ছি সেগুলো অকথ্য, কান পাতা অসহ্য। সঞ্জয় বলেছিল, তার হৃদয়ের না কি মৃত্যু হয়েছে, সেখানে উৎসাহের কোন রঙ আর উপস্থিত নেই। বললো, চিন্তায় নিয়ে কাকে আমি উড়ে যাচ্ছি মেঘ-মেঘান্তরে! কোলে করেই আমার চিরন্তন মিথ্যাসমুহ সহ আমাকে। আমার যে-কোন বিভাজিত মনস্তত্ত্বকে বেড়িয়ে শাঁ শাঁ করে উঠে যাচ্ছে আমার মর্ম, সত্য ভেদ করে আসলে। কী পেরিছি কতটুকুই বা কর্তব্য তার মুসাবিদা নিয়ে হাজির হয় অতীত; আমার বর্তমানের দুইপা জড়িয়ে ধরে থাকে। কিন্তু অনির্মিত উন্মুখ আধিদৈবিক নিয়তি তাকেই সান্তনার ছলে করছে অভিসম্পাত। এভাবে দোয়া-বদদোয়া খেলার একপর্যায়ে দৈব নিজেও লুটায়ে পড়ে অতীতের তৃণমূলের পরে।
তারপর…
এই চিন্তা- চিন্তায় সময়-বিয়োগ- তুলে নিয়ে এসে আমার চারাসহ আস্ত দুনিয়া, আমাকে ফের বপন করে ভিন্ন জলবায়ুর সংসারে। মেঘ একটা কথার-কথা, আদতে আমি চিন্তায় করে নিয়ে যাচ্ছি একটা জলজ্যান্ত দুর্বিপাক সম্ভব-সবখানে।


হঠাৎ তীরে ভেসে আসা একটা ঝিনুক হাতে তুলে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো, কী আছে তার ভবিষ্যতে, সে কী তার জীবদ্দশায় জানতে পারবে চরম পুরুষার্থ, এই জীবনে সে কি পারবে অসুবিধায় রয়েছে যে সকল মানুষ তাদের হিত করতে! আমি সঞ্জয়কে উত্তরে যা কিছু বলেছি তা তোমাদের বলা যাবে না, তোমরাও যদি আছড়ে পড়া ঢেউয়ের মতো ভেঙে যাও।
সূর্যবেদনা ছাড়তে চায় না জীবন, সে ব’লে, রোজ নতুন নতুন কিরণ নিয়ে ফোঁটে এবং ফুঁটায়। বলহীন খচ্চরের রথে যেতে যেতে দাগায় মুক্তির প্ল্যানচেট। স্পর্শে তার নেই কোন চমৎকার। পলক খুলে দৃষ্টির স্টিমার যার ছেড়ে গেছে চোখের নদী, দুইকালের দুইপাড় আজো তার দুলছে ভ্রমণের উচ্ছ্বাসে, ছুঁবে তাকে কে, আপ্রাণ!
এই সব জিজ্ঞাসা সঞ্জয়ের আর তার কথার রেশ ধরে নেমে আসে সাঁঝ। আমাদের খুরের দেবে যাওয়া বালি, পানিতে মিলিয়ে যায় পরপরই, ভ্রমণের চিহ্ন। সমস্ত অতীত, বর্তমান এক-একটা টুকরোর মতো। টুকরোগুলো জোড়া দিলে একটা জলাভূমি হয়, ভবিষ্যৎ যেখানে শান্ত একটা সৌরভ নিয়ে ফোটে। কে আর দিতে পারে তা? আমরা কার যেন ছদ্মবেশে একটা জীবন কল্পনা করি। কার যেন ছায়া হয়ে ভ্রমণ করি প্রতিবিম্ব-জীবন। তুইওতো মানিস মানামানি চলেনা মানমন্দিরে, সেখানে উড়নচণ্ডীর উৎসব নিত্যঔরশে। যে বৃক্ষের ফুল তোর মগ্নতা তার মূলাধারে চক্রাকারে কিসের পাহারা দেয় বিষধর কিংকোবরা?
সঞ্জয় আমার দিকে তাকায়, আমি তার দিকে। সন্ধ্যা বড় বর্ণচোরা। তার ধোঁয়া-ধুধু নেকাব আরো স্ফীত হচ্ছে, আর প্রলম্বিত হচ্ছে আমাদের কথার একটানা বেলাভূমি। পশ্চিমের দিকে তাকাতে তাকাতে আমি বললাম, দেখ দোস্ত, আজ ঢুবে যাচ্ছে। আমাদের বর্তমান। আমাদের আগামী নিয়ে সে ফের উঠবে আমাদের পিছেই। আচ্ছা, আমাদের পেছনে কী? সে বললো, ঝাউগাছ।
চল, আমরা আমাদের ভবিষ্যতের দিকে উড়ে যাই…আর আমারা দুজন, রেসকোর্স থেকে পালিয়ে আসা দু’টি ঘোড়া ভবিষ্যতের পানে, পেছনে যাব বলে উড়াল দিলাম।

আমাদের পরিজন কালুনি


আমাদের ভোর ভাঙতো বাঁশপাতার শব্দে, আমের বইল পড়ার তালে। শিবা-বাঁশ, উরা-বাঁশের বিরাট ডোঁয়ার পাশে চাপকলের তলা থেকে ডেকসি মাজার খসখস আওয়াজ আসতো আর ঘুম আরও গাঢ় হয়ে জমতো।
উদাহরণস্বরূপ এমন এক সকালে; গোয়ালে পাওয়া গেলো না পোয়াতি কালুনিকে। কালুনি ছিল আমাদের মত কৃষ্ণ, খর্বকায়। তার অসহায় চোখের চাহনিতে কি যেন এক অভিব্যক্তি ছিলো। বছর বছর বাচ্ছা বিয়োতো, লাল হলুদ আর ওর মতো কালো-কালো। আমাদের ভাতের ডেকসি উপছে পড়া ফেনটুকু যা নুন-চিনি দিয়ে আমরা- ছোটরা -খেতাম, আম্মা বলতেন- ভাতের ফেনে-মাড়ে বল হয়, বাদবাকি খেতো কালুনি, আরও খেতো কাঁঠালের ভোঁতা। মাদারকাঁটার মত কাঁটাবহুল খোসাটাই ছিল তার সবথেকে প্রিয়। টমেটোর মৌসুমে যখন বাজার ভরে উঠতো সবুজ, লাল টমেটোতে, তখন দাদা সস্তায় বস্তাভরে নিয়ে আসতেন অনেকগুলো বাজারে-বাতিল খাট্টাবায়ন। কুঁড়া-খৈলের সাথে যেগুলো কালুনি মুখ ডুবিয়ে খেতো।
মোটকথা কালুনিও ছিল আমাদের পরিজন আর আমরাও কালুনির দুধের মুখাপেক্ষি। কিন্তু সবথেকে প্যাথেটিক ছিল দুধ-দোয়ার দৃশ্য। রাতভর অদূরে বাঁধা বাছুরটাকে যখন দড়িখুলে ছেড়ে দিত ওরা, দৌঁড়ে গিয়ে বাচ্চাটা ঝাঁপিয়ে পড়তো কালুনির দুধের উলানে। মোটা-মোটা আঙ্গুলের মতো দুধের শলাগুলো চুষে চুষে উলানে সবে বাড়ি দিয়েছে দুই এক, দুধ আসা শুরু হয়েছে কি হয়নি, বাছুরটাকে আবার টেনে হিছড়ে দুধের-বাট থেকে আলগা করে সব দুধ দুয়ে নিয়ে আসা হতো আমাদের জন্য। তারপরও কালুনি হয়ত বাচ্চার জন্য কিছু রেখে দিতো। কেননা বাচ্চাটা এর পরেও অনেক্ষণ ধরে চুষে যেতো তার অধিকারের তলানিটুকু।
কাঁঠাল ছিল আমাদের জন্য যথার্থই দরকারী ফল। সকালে পান্তাভাতের সাথে, ভাপ-উঠা লালভাতের মাঝে হলুদ হলুদ কাঁঠালের আঁশগুলো ফুটে উঠতো পুবাকাশে সুবেহ-সাদিকের তসবির যেন; যার দিকে ফজরের নামাজ শেষে আমরা তাকিয়ে থাকতাম অসংখ্য খটকা নিয়ে খালপাড়ে দাঁড়িয়ে।কোঁয়ার মাংস খাওয়ার পর কাঁঠালের বিচিগুলো ছুঁড়ে দেওয়া হতো মাটিরচুলার উঁচু পাড়ে। যখন বিচিগুলো শুকিয়ে আসতো চুলার কাঠ-কয়লার আগুনে কাঁঠালবিচি পুড়িয়ে বানানো হতো লাল-মরিচের ভর্তা।
যে ভোরের কথা বলছি, সেদিনও আমাদের বাড়িতে কাঁঠাল ছিল। সোয়াবিন তেলে হাত মেখে ভাঙ্গা হচ্ছিলো তার একটা।তুলে এনে কোঁয়া, ভরা হচ্ছিল এলমোনিয়ামের বাদিয়া। কিন্তু এর মধ্যে কোন ফাঁকে, কি কারনে যেন দড়ি ছিঁড়ে পালালো কালুনি।
যখন ঘরের কাজের ছেলে আলিয়াম্মদকে পিটানো হচ্ছিল কাঁঠালগাছে বেঁধে, আর সে চিৎকার করছিলো, ‘ও হাট্টল গাছ-রে, ও আল্লা-রে- আঁরে বা-চো-ও-ও’ বলে তখন অনেকের সাথে আমারও উড়ে যায় চোখের ঘুম। আলিয়াম্মদের আহাজারি ঘিরে আরা-পাড়া সবাই যখন সমবেত; এমন সময় এক মজদুর আমাদের উঠানে এসে দাঁড়ায়। কালুনির খোঁজ বলে সে আমাদের। কালুনি তখন মেইন রোডে চৌধুরী ভবনের ওখানে দুই বিল্ডিংয়ের ফাঁকে আটকে পড়ে আছে।
পোয়াতি-পেট নিয়ে সে দেবে-গেছে ঠেসে, ঠাসাঠাসিতে। আর এই সংবাদে অস্থির বাড়ির-বড়োরা বাঁশের ডোয়া থেকে দুইটা বড়বড় উরা-বাঁশ কেটে নিয়ে যখন কালুনিকে উদ্ধার করতে গেলো তখন সেখানে অলরেডি শ’খানেক মানুষের হল্লা। একজন এসে আব্বাকে বললো- সব দোষ ঐ কাঁঠালের ভোঁতার। কে যেন সকালসকাল কাঁঠালের খোসা-ভোঁতা ফেলছে দুই বিল্ডিংয়ের মাঝের দেড়-হাত ফাঁকে। ওগুলো খেতে গিয়ে, খেয়ে দেয়ে, তারপরই তো পেট ডোল হয়ে আটকে গেলো কালুনি।
কিন্তু সবাই উৎসুক, গাবিন-গাই কালুনির বাচ্চাটার কি হয় দেখবে! গ-ৎ গ-ৎ আওয়াজ করে কি যেন জানাচ্ছে কালুনি। হাম্বা ডেকে ডেকে। তারপর যখন আমার বাপ-চাচারা একটা বাঁশকে কালুনির চারপায়ের মাঝে ঢুকিয়ে, অনেক ধস্তাধস্তি শেষে কালুনিকে উঠিয়ে আনলো বাইরে তখন তার জরায়ু মুখ খুলে গিয়ে জল পড়া শুরু হয়েছে।
এবং তারপর একজন দক্ষ লোকের হাতে আমাদের লাইল্লা-কে বিয়োবার পর কেমন যেন চাঙ্গা বোধ করে কালুনি। আর ঐ কাঁঠাল নাকি ঘাস মুখে এনে জাবর কাটতে থাকে।