ছায়ার প্রতিলিপি
জলের স্রোতে ভাসছে ব্যধি ও ব্যঞ্জনা
একদিন হয়তো হারিয়ে যাব
তোমার ঠিকানা-কাটা সিগন্যালের নীচে
এবং নিজেকে খুঁজে পাবো
বিছিয়ে রাখা পাহাড়ি ঝরনার তলে—
মাটির মতন গভীর আর একাকী।
প্রেমের উৎস সন্ধানে
আমি ভেসে যাই অসামান্য নদীশরীরে—
খুঁজতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ি,
তোমার ভেসে ওঠা মুখের দিকে তাকিয়ে
আরও একটিবার,
বিস্ময়ের এক টুকরো সৌন্দর্য
অথবা এই মুহূর্তের মতো
স্রোতের ওপরে তোমার ছায়ার প্রতিলিপি।
এ কেবল আকাশের অনিবার্য প্রতিদান—
এ কেবল উড়ন্ত মেঘের সাথে
বসে থাকা আমার মন।
উপলব্ধি
এলোমেলো সন্ধ্যায় দাঁড়িয়ে থাকি, চোখে ভাসে
পেছনের পায়ের চিহ্নজ্জবুকে চাপা শোণিত;
কত শতবার জিজ্ঞেস করেছি, কেন বাঁচি আমরা!
পৃথিবী ঘুরে পড়ে থাকি ঠোঁটে ফাঁকা বুলি নিয়ে;
শুকনো পাতা উড়ে যায় নিজস্ব নিয়মে, মরে যায়
অরুণোদয়ের সংগীতজ্জপথে এলে না প্রণয়ী!
শহরে ফানুসবাজির মঞ্চে বিচিত্র বৈভব!
কোলাহলে ভেসে আসে বিদেহী আত্মা, হারানো কিছু প্রেম;
যে-দুচোখ সহসা ছড়ায় স্মৃতি, জানালায় ঝরে
প্রেমিকার গন্ধ, এক রাতের আবেগ
ভুলে গিয়ে যত প্রশ্নজ্জঘুরে এসে থেমে যায়।
অপরাহ্ণে ডুব দিয়ে দেখি, হঠাৎ কী সন্ধানে
গোধূলি এসে আছড়ে পড়ে শাশ্বত প্রবাহে;
দূরের শহর, কান্না-রাত্রিজ্জদেয়ালের মাঝে অস্তিত্ব,
যেন কোনো যাত্রায় হারিয়ে গেছে সন্ধ্যার সংসর্গ।
আমার পাশে ছড়িয়েছে অগণিত অলীক হাওয়া
খোদা, কেন আবার ফিরে ফিরে আসি?
বিশেষ ছায়া থেকে আসে গাঢ় বিদ্বেষ
তবু পথচলা, দীর্ঘশ্বাসে ভরা ব্যথার ভৈরবী;
এতদিন তো কত না বিদ্রোহ করেছি,
তবে কি শুধুই খুঁজে পেয়েছি দল ছেঁড়া পাখির স্রোত?
যে অবস্থায় ঘুরে আসে আকাশে ধ্বংসের পালক
জানি, কখনো পূর্ণতা আসে না সহজে।
অন্তঃসলিলা
নারী, তোমার আঁচলে বহুদিন ওড়ে না জলের গন্ধ
জলের তলায় ডুব দিয়ে আমি টেনে আনি
বিস্তীর্ণ একান্ততা—
তিমিরে নুয়ে থাকা ঘুমন্ত শালুক,
কাচভাঙা চাঁদের নিচে প্রেতবর্ণ মাছেদের ঘূর্ণি,
তুমি জানো না, সেখানে ঘুমও একধরনের হাহাকার…
আমি প্রতিরাতে গুল্মের শরীর ঘেঁষে
তুলি মাটির কাঁপুনি, খোঁজ করি অন্ধকারে
এক আঁচল নিশ্বাস,
পুরুষেরা যেখানে বোনে রেখেছে গোপন বিষণ্নতা
আমার নিদ্রাহীন চোখে ঢেউ তোলে—
মাছরাঙার ডানা, ভাঙা গলার গান,
জলের নিচে ঘুমিয়ে থাকা ধনেশের ঠোঁট
আর নদীর বুকে কেঁদে থাকা অপার জন্ম
নারী, রাত্রির গহিনে আমি বারবার ডুব দিই,
তুলে আনি কিছু অনামা আঘাত, কিছু কোমলতা—
এক স্নিগ্ধ রাক্ষসের মতো
যে কেবল নীরবে ভালোবাসতে জানে…
জন্মের আগে মৃত্যু
জন্মের আগে আদিমতা কাঁদে—
তার নখের নিচে লেগে থাকা
মায়ের রক্তে আঁকা ছিল ভবিষ্যৎ,
জিহ্বা বের করে ছুঁয়ে নিলো গর্ভের গভীর
প্রথম মৃত্যু,
তার কান ফাটল—
যখন ঈশ্বরের নামে রাইফেল ঠেকল
শূন্যের ঠিক পেছনে।
মাঠের ফাটলে ঢুকে থাকা কেঁচোর আত্মা বলে উঠল
‘এই জন্ম নয়, আমরা চাই এক আর্কাইভ’,
পাতা ওল্টালে বনফুল নয়, মেলে হিংস্র প্রেম—
মানুষের ছায়া তবুও গুনগুন করে,
যেন সে সর্বভুক অন্ধ পোকা,
যে প্রেমে ফুরিয়ে যায় না।
নদী একদিন ভেবেছিল সে মা
তাই রক্ত পেলে ফিরে যায় গানে,
আর শিকারি যখন হাঁটে ঈশ্বরের মুখোশ পরে
আমরা ভুলে যাই,
পৃথিবী এক চিৎকার—
নাভির গন্ধে বাঁধা শাবকের শেষ গান।
সমুদ্রগামী ট্রেন
পাড়া ও পাহাড়ের ভেতর দিয়ে চলে যাচ্ছে সমুদ্রগামী ট্রেন
শান্ত বালিয়াড়ির দিকে ধেয়ে চলে, স্মৃতিরা হাসেজ্জ
কতকাল অপেক্ষা শেষে সমুদ্রের কোলে পেতেছে হৃদয়লাইন
মহাসমুদ্রের কূল ঘেঁষে ছড়িয়ে পড়ে সমান্তরালের গল্প!
পাড়া ও পাহাড়ের ভেতর দিয়ে চলে যাচ্ছে ট্রেন,
পথে পথে ধুলো ওড়ে, স্বপ্নের সীমান্ত ডাক পাড়ে
যেখানে গানের সুর সমুদ্রের ঢেউ, কবিতার সকাল
নতুন অনুভূতি নিয়ে আসছে মহাগর্জনের ভেঁপু।
ট্রেনের জানালায় হাত রেখে হাওয়া গায়ে লাগিয়ে
চিরিঙ্গা ফেলে যাই আর নিয়ত নিসর্গের মায়া স্পর্শ করি,
হয়তো সাগরতীরে নেমেই শুনব মৎস্য-ধীবরের কোলাহল,
ওদিকে জোয়ারের ঢেউ ভেঙে পড়ছে সোনালি বালিতে।
প্রতিটি স্টেশন পার করে চলে যাই আরও সুন্দরের কাছাকাছি,
গন্তব্যের খোঁজে, ট্রেনের বগিতে এই প্রথম কাব্যিক ভ্রমণ,
প্রতিটি যাত্রায় রচিত হয় নতুন গল্প, নতুন সুর,
সমুদ্রের কণ্ঠে ফুটছে আকাঙ্ক্ষার আলো, ঝাউয়ের মিতালিজ্জ
ট্রেনের গতি, সমুদ্রের ডাক, গাঙচিলের হাসিজ্জ
মনের মাঝে ঢেউয়ের অনুরণন বাজছে, বেজেই চলেছে…
রেলগাড়ির যাত্রায় জীবনের চিত্রপট আঁকা
একসাথে ভেসে চলছি, খুঁজে ফিরছি পথের সার্থকতা।
ট্রেনে যেতে যেতে
১.
ভাবি, চলন্ত ট্রেনে মানুষগুলি কেমন নিঃসঙ্গজ্জ
কতদূর ছুটে যাচ্ছে, নির্বাক চেহারায় লুকানো গল্প;
বহু আগে হারানো প্রেমের কথা মনে পড়ে,
কল্পনার রেখা মুছে গেছে দিনলিপির পাতায়।
নিঃশব্দতার বুক চিরে তাদের নিশ্বাসের আওয়াজ
ছড়িয়ে পড়ে, আমাদের রক্তের স্রোত গেয়ে যায়।
২.
গভীর রাতে, যখন স্তব্ধতা এসে বসে,
ট্রেনের হুইসেল ভেসে যায় অন্য কোনো জগতে;
মানুষের দৃষ্টি খোঁজে ছায়ার নিত্যযাত্রাজ্জ
তাদের কোমল পা আবারও যায় মিলনে কিংবা বিচ্ছেদে;
সময় ধুসর হয়ে আসে, যাপনের দোলায়
কখনো মৃত্যুর ভেতর এক জীবনের খোঁজ নেয় তারা।
৩.
বৃত্তের মতো ঘুরতে থাকে সময়ের সাঁকো
অচেনা শহরের দিকে যাত্রা, বুকে তুমুল আশা;
নির্জনতার রেখায় উঠে আসে একটি হাত,
স্পর্শে মনে পড়ে কোনো খোঁজ নেওয়া সময়;
মায়ার চাদরে ঢাকা মানুষের আকাঙ্ক্ষা
রক্তের স্রোত যেন চুপচাপ বয়ে যায় কালক্রমে।
৪.
ভোরের আলো যখন ধীরে আসতে থাকে
কিছু হারানোর ক্ষণে নতুন কিছু পাওয়া যায়।
মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নিস্তব্ধ মুখগুলো
দেখতে পায় ভঙ্গুর পথে ছড়িয়ে থাকা স্বপ্ন;
যেতে-যেতে দেখা হয় উড়ে যাওয়া পাতা
বাতাসে ভাসমান স্মৃতি, যা কখনো শেষ হয় না।
৫.
এ পথে অনেক গল্প, অনেক ক্ষরণরাশি
তবুও ফিরতে হবে ফের, এই ভাবনা মনে থাকে;
রেললাইন ধরে চলে যায় শত-শত হৃদয়,
দিন আর রাতের সীমান্তে লুকিয়ে চলা
পাথরের কাঁপনে ফুরিয়ে যায় যে ডাক
জীবনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে আমাদের শিরদাঁড়া।
৬.
পথের তো শেষ নেই, রোদ আর বৃষ্টির খেলা
সবাই চলে যায়, তবুও কিছু থাকে চিরকাল;
গাছের ডালে কাঁপছে বাতাস, জীবনের গান
যতবার হারাই, ততবার ফিরে আসে চিহ্নের টান।
পথের দিকে তাকালে দেখি চিরন্তন নীরবতা
তবুও বুকের ভেতর বাজে এক অশ্রুত শব্দের সুর।
৭.
ভোরের কুয়শায় মিশে যায় গন্তব্যের রেখা
ব্রিজের নিচে থেমে থাকা জলরাশি যেন গল্প বলে,
ট্রেনের চাকায় ছন্দ বাজে, পথ বেয়ে ছড়িয়ে যায়
যেন হাজারো মানুষের চলার পথ
অজানায় মিলিয়ে যাচ্ছে হৃদয়ের কলকল।
প্রতিটি থেমে যাওয়া স্টেশনে
এক-একটি স্বপ্ন, এক-একটি দ্যুতিময় আশা
যতবার ট্রেন যায়, ততবার মনে পড়ে,
ভালোবাসা, বেদনা আর শেষ পর্যন্ত—যাত্রার অমোঘ গান।