আবু সাঈদ তুলু’র ঐতিহ্যায়ন: নির্বাচিত প্রবন্ধাবলি’ পাঠ

ঐতিহ্যায়ন কভার

বাঙালির ঐতিহ্যের জন্য ঠিক কোন বিষয়টি তুলে ধরতে হবে, সেটি ভাববার আগে বুঝতে হবে কবিতা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, নাটক, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব, চলচ্চিত্র যা কিছু নির্মিত হয়, তৈরি ও সৃষ্টি হয়, তা মূলত কারা সৃষ্টি করে, কেন সৃষ্টি করে, কারা তাকে শ্রেণির পারপাসে ব্যবহার করে? একটি জাতির সংবেদনকে বুঝতে হলে সে জাতির সঠিক ইতিহাস জানাটা জরুরি। সময়ের ভেতর দিয়ে আমরা অতীতে বা ঐতিহ্যে প্রবিষ্ট হয়, বর্তমান তা তৈরি করে, ভবিষ্যতকে আমরা টেনে আনি। এই আধেয়ে যা রূপ ও অরূপের বেদনা বহন করে। তাহলে অতীত হতে পারে স্মৃতি, স্মৃতিই ঐতিহ্য, বর্তমান তার রেখা। ঐতিহ্যের কথা বলতে গেলে আমাদের অক্ষরের বিম্বিত হতে হয়, বহু জনের সংবেদনকে একটি ঐক্যের রেখবিন্দুতে স্থিত করতে হয়।

বিন্দু মানে ফোঁটা, মানে চিহ্ন। অক্ষর ছাড়া অতীত কিছু কথার সমষ্টি, কিচ্ছা, কাহিনি, পূর্বপুরষের মৌখিক গল্প, টোটেম ও টাবু। তাই, দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি ছাড়া ঐতিহ্য ও ইতিহাসের প্রকৃত বিচার, বিশ্লেষণ, পর্যবেক্ষণ সম্ভব নয়। আমি তো সমাজের কোনো বিধায়ক নই, তবে সংবেদিত মানুষ। পুঁজিবাদের যুগে ভালো বা মন্দের পার্থক্য নির্ণয় করতে পারে এমন একজন চেতন মানুষ। আপনাকে মাথায় রাখতে হবে কোন্ সময়ে এসে, আপনি কোন্ বিষয়ে লিখছেন। ‘আধুনিক সময়ে ব্যক্তিমনের গতিপ্রকৃতি বা আবেগ চূড়ান্ত নীরস; একমাত্র সামান্ততান্ত্রিক সময়ে একজন রাজা বা নেতার আবেগের কোনও অর্থ ছিল। আজকে তা আর নেই। এমনকি হিটলারের ব্যক্তিগত আবেগও জার্মানিকে তার আজকের জায়গায় পৌঁছে দেয়নি। দুর্ভাগ্যই বলতে হবে। তার নিজস্ব অনুমাণ থেকেও সে অনেক বেশি একজন যন্ত্রমাত্র, নিয়ন্ত্রক নয়।’

‘সুতরাং ঐতিহ্য প্রয়োজনীয়তাকে অতিক্রম করেছে।’ এখন আর সে তার নির্দিষ্ট লভ্য জিনিসপত্রের ব্যবহার দিয়ে আধুনিক ব্যাপার-স্যাপার, অগ্রগমনকে প্রতিনিধিত্ব করতে সক্ষম নয়। ব্রেটল ব্রেশটের ভাষায় বলতে পারি ঐতিহ্যকে তার নিজস্ব ক্ষেত্রে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে, তাল মিলাতে হবে সময়ের সঙ্গে ঘটে চলা সব রকমের অগ্রগতির সঙ্গে।

শিল্প ও ঐতিহ্য নিয়ে আমার এমন ভাবনার মধ্যে সম্প্রতি হাতে এলো লেখক আবু সাঈদ তুলোর প্রবন্ধগ্রন্থ ‘ঐতিহ্যায়ন: নির্বাচিত প্রবন্ধাবলি’ । ডিসেম্বর ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দে অয়ন প্রকাশন থেকে প্রকাশিত এই গ্রন্থে মোট ১৫টি প্রবন্ধ সঙ্কলিত হয়েছে। প্রবন্ধগুলোর শিরোনামেই স্পষ্ট লেখকের মনোযোগ মূলত বাংলা সাহিত্য, নাটক, সংস্কৃতি, নন্দনতত্ত্ব ও ঐতিহ্য নির্মাণের ধারাবাহিকতায়। ‘বাংলা সাহিত্যরীতি: অদ্বৈত মার্গ নন্দন’ থেকে শুরু করে ‘শিল্প-সাহিত্য নন্দনভাবনা ও নৈতিকতা’ এই দীর্ঘ পরিসরে লেখক বাঙালির ঐতিহ্যকে একটি সামগ্রিক সাংস্কৃতিক কাঠামোর ভেতর বিন্যস্ত করার চেষ্টা করেছেন।

এই গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত প্রবন্ধগুলো হলো ‘বাংলা সাহিত্যরীতি: অদ্বৈত মার্গ নন্দন, বাংলার প্রাচীন সংস্কৃতি, কবিতার পাঠক, পাঠকের কবিতা, ‘রসুল বিজয় কাব্য: অন্তরালে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস, বাংলা নাট্য: তত্ত্ব ও রীতি, বাংলার নাট্য ঐতিহ্য, উত্তরাধুনিক নাট্যতত্ত্বের পূর্বাপর, পালা-বাংলার ঐতিহ্যবাহী নিজস্ব নাট্য, ঐতিহ্যের ধারায় বাংলাদেশের নাট্যচর্চা, নাট্য সমালোচনার কথকতা, বাংলা নাট্য পরিভাষার ভাঙাগড়া, বাংলা বর্ণমালা কীভাবে এলো, প্রযুক্তির যুগে সাহিত্য, বিউপনিবেশায়ন: বাঙালির ভয়টা কোথায়?, শিল্প-সাহিত্য নন্দনভাবনা ও নৈতিকতা। শিরোনামগুলোর মধ্যেই লেখকের মন কোন দিকে ইঙ্গিত করছেন তার প্রবণতা স্পষ্ট, তিনি বাঙালির শিল্প-সাহিত্য, নাট্যচর্চার একটি ঐতিহ্যগত ধারাবাহিকতার নির্মিতিকে শনাক্ত করেছেন।


এই প্রবন্ধগ্রন্থের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো লেখক ইউরোপীয় আধুনিকতা ও পাশ্চাত্য তাত্ত্বিক আধিপত্যের বাইরে দাঁড়িয়ে বাঙালির নিজস্ব সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে পুনর্মূল্যায়নের চেষ্টা। তিনি দেখাতে চান যে বাংলা সাহিত্য, নাট্য ও সংস্কৃতির শিকড় বহু গভীরে প্রোথিত; এগুলোর নন্দনবোধ, রীতি ও ভাষা ইউরোপীয় অনুকরণে নির্মিত নয়, দেশজ অভিজ্ঞতা, লোকায়ত ধারার ভেতর থেকেই বিকশিত।
বিশেষ করে বাংলার প্রাচীন সংস্কৃতি, রসুল বিজয় কাব্য: অন্তরালে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস, পালা-বাংলার ঐতিহ্যবাহী নিজস্ব নাট্য, বাংলার নাট্য ঐতিহ্য এই প্রবন্ধগুলোতে লেখক ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা নির্মাণে সচেষ্ট। তিনি মধ্যযুগীয় কাব্য, লোকনাট্য, পালাগান, ধর্মীয় আখ্যান ও সামাজিক আচারকে একত্র করে বাঙালির একটি সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় নির্মাণ করেছেন। এই আত্মপরিচয়ের ভেতর দিয়ে তিনি প্রকারান্তরে একটি সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করতে চান যেখানে বাঙালির শিল্প-সাহিত্যকে ইউরোপীয় মানদণ্ডে মাপার প্রয়োজন নেই।


এই ঐতিহ্য নির্মাণের ভেতরেই কিছু মৌলিক প্রশ্ন অনুচ্চারিত থেকে গেছে, গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক এ বিষয়টি বইতে কোথাও পরিলক্ষিত হয়নি। লেখক যে ‘ঐতিহ্য’-র কথা বলছেন, তা আসলে কার ঐতিহ্য? বাঙালি কি একটি সমজাতীয় জনগোষ্ঠী? ইতিহাস ও সংস্কৃতি কি সবার জন্য সমানভাবে নির্মিত হয়েছে? এই প্রশ্নগুলো গ্রন্থে খুব কমই উচ্চারিত হয়েছে। আমরা যদি বাঙালির ইতিহাস লিখি কোন্ বাঙালির ইতিহাস লিখি? আমরা যদি ঐতিহ্যের কথা বলি, তাহলে কোন্ বাঙালির ঐতিহ্যের কথা বলি? জমিদার শ্রেণির, শিক্ষিত ভদ্রলোকের, নগরকেন্দ্রিক মধ্যবিত্তের, না কি গ্রামীণ কৃষক, ক্ষেতমজুর, শ্রমিক, জেলে, জোলা, পালাগানের শিল্পী, যাত্রাদলের অভিনেতা, কারখানার শ্রমিকের? ঐতিহ্য কোনো নিরপেক্ষ, স্বাভাবিক বিষয় নয়; এটি নির্মিত হয় ক্ষমতার ভেতর দিয়ে, বাছাইয়ের মাধ্যমে, বাদ দেওয়ার মাধ্যমে।


এই গ্রন্থে লেখক প্রায়শই ‘আমাদের ঐতিহ্য’, ‘আমাদের সংস্কৃতি’ এই সামষ্টিক শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছেন। কিন্তু এই ‘আমরা’ কারা সে প্রশ্নটি তিনি স্পষ্টভাবে উত্থাপন করেননি। যে কারণে ঐতিহ্য একটি সামগ্রিক ও কিছুটা বিমূর্ত ধারণা হয়ে উঠেছে। ভাষার একটি প্রতীক, একটি চিহ্ন দিয়ে পুরো জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যকে চিহ্নিত করার চেষ্টা দেখা যায়। লেখক সেটি স্পষ্ট করতে পারেন নি।
বিশেষ করে শ্রেণি সংগ্রামের প্রশ্নটি এখানে প্রায় অনুপস্থিত। শিল্প-সাহিত্য, নাট্যচর্চাকে লেখক মূলত নন্দনতাত্ত্বিক, ঐতিহ্যগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন। উৎপাদনের সম্পর্ক, শ্রেণি দ্বন্দ্ব, ক্ষমতার কাঠামো এসব প্রসঙ্গ সচেতনভাবে আলোচিত হয়নি। ইতিহাস আমাদের শেখায় শিল্প ও সংস্কৃতি কখনোই শ্রেণি-নিরপেক্ষ নয়। কোন সাহিত্য লিখিত হবে, কোন নাট্যধারা টিকে থাকবে, কোন ভাষা প্রমিত হবে এই সবকিছুর পেছনে কাজ করে সামাজিক ক্ষমতা ও শ্রেণি রাজনীতি।


বাংলা নাট্য পরিভাষার ভাঙাগড়া, বাংলা বর্ণমালা কীভাবে এলো, এই প্রবন্ধগুলোতে ভাষা ও পরিভাষার ইতিহাস আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু ভাষার সঙ্গে যুক্ত শ্রেণি ও ক্ষমতার প্রশ্ন সেখানে তুলনামূলকভাবে দুর্বল। প্রমিত ভাষা কাদের ভাষা হয়ে উঠল, লোকভাষা কেন প্রান্তিক হলো এই প্রশ্নগুলো অনুচ্চারিত থেকে গেছে।
লেখক কোথাও কোথাও অচেতনে রাজনীতিকে স্পর্শ করেছেন। বিউপনিবেশায়ন: বাঙালির ভয়টা কোথায়? প্রবন্ধে তিনি উপনিবেশিক মানসিকতার প্রসঙ্গ তুলেছেন। এখানে তিনি দেখাতে চেয়েছেন উপনিবেশ শেষ হলেও সাংস্কৃতিক, মানসিক উপনিবেশ এখনো রয়ে গেছে। কিন্তু এই উপনিবেশিকতার সঙ্গে দেশীয় শ্রেণি কাঠামোর সম্পর্ক কী সে বিশ্লেষণ অনুপস্থিত। উপনিবেশিকতা কেবল বাইরের চাপ নয়; এটি দেশীয় অভিজাত শ্রেণির মাধ্যমেও পুনরুৎপাদিত হয় এই দৃষ্টিভঙ্গিও এখানে অনুপস্থিত।

একইভাবে প্রযুক্তির যুগে সাহিত্য প্রবন্ধে লেখক আধুনিক প্রযুক্তি, সাহিত্যচর্চার সম্পর্ক আলোচনা করেছেন। কিন্তু প্রযুক্তির ব্যবহার কার হাতে, কার জন্য, কোন শ্রেণির মানুষ এতে সুবিধা পাচ্ছে, বঞ্চিত হচ্ছে এই প্রশ্নগুলো এখানে গুরুত্ব পায়নি। প্রযুক্তি নিজেই একটি সাম্রাজ্যিক, পুঁজিবাদী, উদারনৈতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা এই উপলব্ধি প্রবন্ধে পূর্ণতা পায় না। গ্রন্থে প্রাকৃতজনের উপস্থিতি একেবারে নেই এ কথা বলা যাবে না। লোকনাট্য, পালা, যাত্রা, মধ্যযুগীয় কাব্যের আলোচনায় সাধারণ মানুষের সংস্কৃতির কথা এসেছে। প্রাকৃতজনের সংগ্রাম, বঞ্চনা, শ্রেণিগত অবস্থান প্রায়শই নন্দনতাত্ত্বিক আলোচনার আড়ালে চাপা পড়ে গেছে। তারা হয়ে উঠেছে ‘ঐতিহ্যের বাহক’, ‘ইতিহাসের বিষয়’ নয়।

নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চা আমাদের দেখিয়েছে ইতিহাস ও ঐতিহ্য মানে কেবল রাজা, কবি বা নাট্যকারের কীর্তি নয়; কৃষক বিদ্রোহ, শ্রমিক আন্দোলন, লোকায়ত প্রতিবাদও ইতিহাসের অংশ। কিন্তু এই গ্রন্থে ঐতিহ্য মূলত সাংস্কৃতিক গৌরবের জায়গা হিসেবে হাজির হয়েছে, সংগ্রামের জায়গা হিসেবে নয়। তবু এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ‘ঐতিহ্যায়ন: নির্বাচিত প্রবন্ধাবলি’ একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। এটি আমাদের নিজেদের দিকে ফিরে তাকাতে শেখায়। ইউরোপীয় আধুনিকতার চোখে নয়, নিজেদের অভিজ্ঞতার আলোকে শিল্প-সাহিত্য ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। বাংলা নাট্যতত্ত্ব, নাট্য ঐতিহ্য, নন্দনতত্ত্ব বিষয়ে একত্রে এমন আলোচনা বাংলা প্রবন্ধসাহিত্যে তুলনামূলকভাবে কম।


এই গ্রন্থ আমাদের সামনে একটি প্রয়োজনীয় প্রশ্ন তোলে ধরে যে- আমরা কি নিজেদের ঐতিহ্যকে যথাযথভাবে চিনি? আমরা কি কেবল পাশ্চাত্যের মানদণ্ডেই নিজেদের মাপছি? এই প্রশ্নগুলো আজকের সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে এই গ্রন্থ আমাদের জন্য একটি শূন্যস্থানও রেখে যায় যেখানে শ্রেণি সংগ্রাম, ক্ষমতার রাজনীতি, প্রাকৃতজনের ইতিহাসকে যুক্ত করে নতুনভাবে ঐতিহ্যকে পুনর্নির্মাণ করার বিষয়টি। ঐতিহ্যকে যদি আমরা গৌরবের স্মারক হিসেবে দেখি, তবে তা জীবন্ত থাকে না। ঐতিহ্য তখনই জীবন্ত হয়, যখন তাকে সংগ্রাম, দ্বন্দ্ব ও পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে দেখা যায়।
এই অর্থে, আবু সাঈদ তুলু’র ‘ঐতিহ্যায়ন: নির্বাচিত প্রবন্ধাবলি’ একটি সমাপ্ত ভাষ্য নয়; এটি একটি সূচনা। এটি আমাদের ঐতিহ্য নিয়ে ভাবতে শেখায়, আবার সেই ভাবনার সীমাবদ্ধতাও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। ভবিষ্যৎ পাঠক, গবেষকদের দায়িত্ব থাকবে এই ঐতিহ্যচর্চাকে শ্রেণি-সচেতন, রাজনৈতিক ও প্রাকৃতজনমুখি করে তোলা। সেই জায়গাতেই এই গ্রন্থের গুরুত্ব এটি বিতর্কের জন্ম দেয়, প্রশ্নের জন্ম দেয়, নতুন পাঠের সম্ভাবনা তৈরি করে। এই গ্রন্থে লেখক শ্রেণির যে চেতন পর্যায় তার সংবেদনে সৃষ্টিশীল হতে পারেনি, লেখক বুঝতেই পারেনি শ্রেণি বলে আসলে জগতে কিছু আছে। আমাদের ঐতিহ্য হবে ইতিহাসের বিষয়, বাহক নয়। বিষয় ও বিষয়ীর পার্থক্য ধরতে পারলে এই গ্রন্থটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।