তানভীর রাতুলের ‘কী সব বালছাল! ও অন্যান্য কবিতা’

তানভির রাতুল

‘কী সব বালছাল! ও অন্যান্য কবিতা’ শিরোনামটি প্রথমেই পাঠককে চমকিত করে দেয়, খানিকটা অস্বস্তিতেও ফেলে, আবার আকর্ষণ করে তারও অধিক। কবি এটি ইচ্ছাকৃত ভাবে করেন। এটি কোনো ভদ্র, অলঙ্কারমণ্ডিত কথা নয়, তবে এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবন-যাপনের কথার একটি বাস্তবতা; আমরা কথায় কথায় ‘বালছাল, বালস্য বাল’ এসব ব্যবহার করি। লেখার বেলায় সাত্ত্বিক হয়ে উঠি। একবিংশ শতাব্দী কিন্তু ষাট দশক নয় যে এ সময় এসেও তরুণ কবি তার কবিতায় রাগঢাক রেখে লিখবেন। কবি তানভির রাতুল খুবই সংবেদনশীল, তার কাব্যিক সাহস ও সৌন্দর্য সময়কে বহন করে চলে। কবিতায় ভাঙচুর, সময়কে উলটে-পালটে দেখা, বাস্তবতাকে পরাবাস্ততায় নিয়ে যাওয়ার একটি সৎ সাহস তার আছে।

এটি বলতে পারি একটি রাজনৈতিক, সামাজিক, দার্শনিক ও অস্তিত্ববাদী বিস্ফোরণ। কবিতাগুলো একত্রে পড়লে স্পষ্ট হয়, এটি শুধু কবিতার বই নয়, এটি এক ধরনের প্রতিবাদী দলিল, সমকালীন বাংলাদেশের ও বৈশ্বিক মানবসমাজের এক নির্মম এক্স-রে।
এই সঙ্কলনের কবিতাগুলো বিষয়বৈচিত্রে বিস্তৃত হলেও একটি কেন্দ্রীয় সুরে বাঁধা ক্ষমতা, সহিংসতা, পরিচয় ও ভণ্ডামির বিরুদ্ধে প্রশ্ন। এগুলো শুধুই কবিতা নয় কবিতার প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে লেখা একেকটি বুলেট। কবি যেন বলতে চান কবিতা কোনো সৌন্দর্যের আশ্রয় নয়, বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়ানোর অস্ত্র।

‘বাংলাদেশ’, ‘বাংলাস্থান’, ‘আমাদের মুক্তিযুদ্ধ’, ‘বাংলাদেশে রাজনীতির নিয়ম’, ‘জাতীয়তাবাদ’, ‘গণহত্যার টেলিভিশন’, ‘মাখন অথবা বন্দুক’ এই কবিতাগুলো রাষ্ট্র, ইতিহাস ও ক্ষমতার নির্মম ব্যঙ্গচিত্র। এখানে মুক্তিযুদ্ধ কোনো পবিত্র স্মারক নয়, ব্যবহৃত ও বিকৃত একটি রাজনৈতিক পণ্য। জাতীয়তাবাদ উঠে আসে এক ধরনের সহিংস আবেগ হিসেবে, যেখানে মানুষ নয় আইডিয়া ও পতাকা বড়।
‘গণহত্যার টেলিভিশন’ কবিতায় মিডিয়া-সভ্যতার ভয়াবহতা ধরা পড়ে যেখানে মৃত্যু বিনোদন, দর্শক নির্দোষ নয়। এই কবিতাগুলোতে কবি নৈতিক উচ্চাসন নেন না; পাঠককেই অভিযুক্ত করেন।
‘একটি রাইফেলের আত্মকাহিনী’, ‘এখানে, কার্তুজ’, ‘সহিংসতা’, ‘শরীরে পেরেক দিয়ে আত্মা মারা’ এই কবিতাগুলোতে সহিংসতা কোনো ঘটনা নয়, এটি একটি চরিত্র। অস্ত্র এখানে মানুষের চেয়ে বেশি সচেতন, বেশি যুক্তিবাদী। রাইফেল কথা বলে, মানুষের হয়ে সাক্ষ্য দেয় এ এক ভয়ঙ্কর কৌশল, যা সহিংসতাকে মানবিক করে তোলে এবং মানুষকে অমানবিক।
‘আমার মৃত্যুতে’ ও ‘তোমার মৃত্যুতে’ কবিতায় মৃত্যু ব্যক্তিগত নয়; এটি রাজনৈতিক, সামাজিক, প্রায়শই পূর্বনির্ধারিত। মৃত্যু এখানে শেষ নয় একটি ভাষ্য।
‘লিঙ্গপরিচয়’, ‘নারীবাদ’, ‘দুই-আত্মা’, ‘ধর্মানুভূতি’, ‘পূর্বপুরুষ-পূজা’ এই কবিতাগুলো পরিচয়ের বহুমাত্রিক সঙ্কটকে তুলে ধরে। কবি স্পষ্ট কোনো মতবাদে আশ্রয় নেন না, বরং প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন। নারীবাদ এখানে স্লোগান নয়, দ্বন্দ্বময় বাস্তবতা। লিঙ্গ কোনো স্থির সত্য নয়, সমাজ আর শরীরের টানাপোড়েন। ‘আমার নাম ভাঙায়ে কাম!’ কবিতাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য এখানে নাম, পরিচয় ও শরীর একাকার হয়ে যায়। এটি একই সঙ্গে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক।

কবিতাগুলির বড় শক্তি তার কালো রসিকতা। ‘সব্বাই মাল খায়’, ‘কুত্তাতন্ত্র’, ‘বানরকে নদী পারাপারে সাহায্য’, ‘পিঁপড়ার ঢিপিতে চিনির দানা’ এই কবিতাগুলো হাস্যকর মনে হলেও ভেতরে গভীর হতাশা ও তিক্ত সত্য লুকিয়ে আছে। কবি এখানে নৈতিক শিক্ষক নন; তিনি একজন নির্মম পর্যবেক্ষক।
‘দাম্ভিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ কবিতাটি বিশেষভাবে সমকালীন এখানে প্রযুক্তি কোনো মুক্তিদাতা নয়, নতুন ধরনের অহঙ্কার ও ক্ষমতার প্রতীক। এই কবিতাগুলোর ভাষা ইচ্ছাকৃতভাবে রুক্ষ্ম, ছন্দ ভাঙা, চিহ্নের ব্যবহার অস্বাভাবিক। কিন্তু এই ভাঙনই কবিতার শক্তি। ‘শব্দ দিয়ে লেখা’, ‘কবি’ কবিতায় কবিতার আত্মসচেতনতা স্পষ্ট। কবি এখানে নিজেকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করান।

‘কী সব বালছাল! ও অন্যান্য কবিতা’ বহুমাত্রিক কবিতার একটি বন্ধন, কাব্যিক সাহস ও সৌন্দর্যের সংবেদ। এটি পাঠককে আঘাত করে, প্রশ্ন করে, ভালোবাসে। ভালোবাসে এটি পাঠক সহজে বুঝতে পারবে না। ঠিক এই কারণেই এটি গুরুত্বপূর্ণ। এটি সেই ধরনের কবিতার বই, যা একবার পড়ে শেষ করা যায় না, মাথার ভেতরে রয়ে যায়, অস্বস্তি তৈরি করে।
এই কবিতা সমকালীন বাংলা কবিতায় এক ধরনের সাহসী অবস্থান। এটি সৌন্দর্যের চেয়ে সত্যকে প্রাধান্য দেয়, শালীনতার চেয়ে সততাকে। যারা কবিতাকে শুধুই আবেগ বা প্রেমের ভাষা ভাবেন, তাদের জন্য এই বই একটি চ্যালেঞ্জ। আর যারা কবিতাকে প্রতিরোধ, প্রশ্ন ও চিন্তার জায়গা হিসেবে দেখেন তাদের জন্য এটি এক অনিবার্য পাঠ।

‘কী সব বালছাল! ও অন্যান্য কবিতা’
কবিতার রাজপথ অনলাইনে প্রকাশিত পাণ্ডুলিপি