তোমাদের শহরে

আগামীকাল আমি শহরে চলে যাব। স্থায়ীভাবে ওখানেই বসতি গড়তে হবে। একমাত্র বড়বোন স্বামী-সন্তান নিয়ে
শহরে থাকে। শহরে তাদের বাড়ী রয়েছে। বড় বোন বলেই দিয়েছে গ্রাম ছাড়তে হবে। নইলে জীবনের ভীত নাকি
শক্ত হবেনা। উন্নতির যোগ দ্রুততর হবে না। আমি মাকে বলেছি-মা আমি উন্নতি চাইনা। গ্রামেই থাকব।
সারাজীবন স্কুল মাষ্টারি করে কাটাব। আর্দশ জীবন-যাপন আমায় পছন্দ। তাছাড়া ছাত্র-ছাত্রীদের বলেছি-
আমি কখনই গ্রাম ছাড়বনা। শহরে কি আছে? যান্ত্রিক একটা জীবন। ইট-পাথরের দেয়ালে না আছে শান্তি। না
আছে ভালোবাসা। মা আমার অন্য কিছু শুনতে নারাজ। আমাকে করুণ স্বরে বুঝালো-“সামনে তোর জীবন পড়ে
আছে। এখনো বিয়ে করিসনি। স্কুল মাষ্টারি করে কত টাকাই বেতন পাস? আমার ঔষধ খরচ যোগাতে হিমশিম
খেতে হয়।”

আমি সুপার্থ সিকদার।হাই স্কুলের শিক্ষক। সুবোধ বালকের মত সিদ্ধান্ত নিলাম গ্রাম ছাড়তে হবে।
এত চেনা, শৈশব কাটানো গ্রাম, বাধ্য হয়ে আমাকে ছাড়তে হচ্ছে।কালকের ট্রেনে সকাল বেলা উঠলে ৩ ঘন্টায়
শহরে পৌঁছে যাব। সেখানে আমার জন্য চাকরি ঠিক করা আছে। দাদাবাবুই ব্যবস্থা করেছেন। আমি শহরে স্থায়ী
হলেই, মা চলে আসবে একসাথে আমরা থাকব।

শেষ বারের মত স্মৃতি বিজড়িত গ্রাম ঘুরতে বেরোলাম।এত সুন্দর আমার গ্রাম। এটা ছেড়ে যেতে হবে
ভাবলে মনটা দুমড়ে-মুছড়ে উঠে। গ্রামের পাশে নদী।সেখানে কিছু জেলে মাছ ধরছে। নদীতে ভেসে আছে ডিঙ্গি
নৌকা। কি অপরূপ দৃশ্য ! ব্যতিত মন নিয়ে আমি বাড়ীর দিকে রওয়ানা দিলাম। সব গোছাতে হবে। সকাল বেলা ঘুম
থেকে উঠে আমি তৈরী হতে লাগলাম।পুকুরে স্নান করতে গিয়ে দেখলাম- এক বার বক উড়ে যাচ্ছে। সাদা বক।
বিদায় নেবার সময় মা বলল-ভালো থাকিস।মন খারাপ করিসনা। আমার চোখে পানি এসে গেল।মাথা নিচু করে
হাঁটতে-লাগলাম ষ্টেশনের দিকে।

শহরে দিদির বাড়ীতে পৌঁছালাম দুপুরে। ট্রেন ছেড়েছে নির্ধারিত সময়ের দুই ঘন্টা পর। শহরের ট্রেন
স্টেশনে সেকি ভিড়।সবাই ছুটছে।কারো দিকে কেউ তাকাচ্ছে না।
মামা তুমি নাকি এখানে থাকবে? হ্যাঁ টুনটুনি সোনা। বড় দিদি তার ছোট মেয়েটাকে টুনি বলে ডাকে। সে
ওয়ান এ পড়ে। ইংলিশ মিড়িয়াম।বড় ছেলেটা এস.এস.সি পরীক্ষার্থী।সে এসে হ্যালো মামা বলে, হাত বাড়িয়ে
দিল।

আমি ভ্রু কুঁচুকে বললাম- পা ধরে প্রণাম কর। সে পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে এল। আমি তাকে বুকে জড়িয়ে
ধরলাম। টুনটুনি খলখলিয়ে হেসে হাততালি দিয়ে উঠল।বিকেলে ভাগ্নেকে নিয়ে শহর দেখতে বেরোলাম। বহুবার এ শহরে এসেছি বেড়াতে। কিন্তু এবার এসেছি স্থায়ীভাবে থাকতে। বড় রাস্তার ধারে ফুটপাতে হাঁটছি। ফুটপাত এখন ভ্রাম্যমান বিক্রেতাদের দখলে। নায়কের মত এক ছেলেকে দেখে বুকটা হাহাকার করে উঠল। তার জিন্স প্যান্টের হাঁটুর অংশ ছেঁড়া। দুই পাশেই একই

অবস্থা।মনটা কেঁদে উঠল। না জানি এ ছেলেটা কত গরিব। খটকা লাগল তার শার্ট দেখে, এটা দামি। বারবার
তাকাচ্ছি দেখে ভাগ্নে বলল- মামা তুমি পিছনে ফিরে কি দেখছ? দেখেছিস ছেলেটার দুই হাঁটুতে প্যান্টের অংশ
ছেঁড়া।ভাগ্নে দাঁড়াল। ওটা লেটেষ্ট জিন্স প্যান্ট। দাম তিন হাজার টাকা। বাবাকে কত করে বলেছি। কিনে দেয়না।
পরীক্ষায় ভাল করলেই নাকি একটা কিনে দেবে। আমি আমতা আমতা করে বল্লাম- কত দাম বলেছিস? তিন
হাজার টাকা।বিশ্বাস হচ্ছেনা? দূর, মিথ্যে বলছিস। না, মামা, সত্যি। এই কোয়ালিটার প্যান্ট নিচের অংশ ছেঁড়া
থাকলে দাম আরও বেশি।ভাগ্নের কথা আমি বিশ্বাস করতাম না।যে ছেলেটাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম সে এমন
একটা দামি গাড়িতে উঠল যে, আমি ভাগ্নের কথা বিশ্বাস করলাম।

কি মামা চলো হাঁটি।ভাগ্নে তাড়া দিল। আমি স্কুলে মাষ্টারি করে সর্বসাকুল্যে বেতন পাই সাত হাজার
পাঁচশত টাকা। হাঁটতে গিয়ে দেখলাম পা আর চলেনা। ভাগ্নে, আর হাঁটতে পারছিনা।চলো ফিরে যাই। ভাগ্নে অবাক
হয়ে আমার দিকে তাকাল।আমি জিজ্ঞেস করলাম-কিছু খাবে? সে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। চল মামা, ফাষ্ট
ফুডের দোকানে যাই। ভাগ্নে চিকেন বার্গার অর্ডার দিল।আমি কিছু খাবনা বলায় একটাই অর্ডার দিল। কি
আগ্রহ নিয়েই না ভাগ্নেটা খাচ্ছে।শুধু ভাগ্নে নয় যারা খাচ্ছে সবাই। বসার কোন জায়গা নেই। সবাই দাঁড়িয়ে
আছে। বিল দিতে গিয়ে পিলে চমকে উঠল।একশত চল্লিশ টাকা।আমি ভাগ্নের দিকে তাকালাম। ভাগ্নে মাথা
নাড়ল।

আজ আমি চাকরিতে জয়েন করতে যাব।সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে রেড়ি হতে লাগলাম।দাদাবাবু জয়ন্ত
বিশ্বাসের দেয়া তথ্যানুয়ায়ী আমি জয়েন করতে যাচ্ছি গামেন্টস কোম্পানিতে। হেড় অফিসে জয়েন। তিনি বিভিন্ন
দিক নির্দেশনা দিলেন। দিদি সুতপা কে, দাদাবাবুকে প্রণাম করে আমি অফিসের উদ্দ্যেশ্য বেরিয়ে পড়লাম।
তুমিতো বিজ্ঞানের ছাএ।অংক তোমার বিষয়। মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললাম।বসে আছি জি.এম এর রুমে। তিনি
একটু্ ইতঃস্তত করে বল্লেন তোমাকে সহকারী হিসাব রক্ষক পদে নিয়োগ দিচ্ছি। আস্তে আস্তে সব শিখে
যাবে। এসে আমার সাথে। প্রথমে অফিসে ঢুকে আমার চক্ষু ছানাবড়া।এতো সিনেমায় দেখানো সেই অফিসের
মত। হিসাবরক্ষণ বিভাগে ঢুকে দেখলাম ছোট ছোট খুপরির মত ঘর।সবাই কম্পিউটার নিয়ে বসে আছে। জি.এম
চীফ এক্যাউটেন্ট স্যরের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বল্লেন এ অংকের শিক্ষক আপাতত আপনার বিভাগে
কাজ শিখুক। আমি হাতে জোড় করে নমস্কার দিলাম।চীফ এ্যাকাউটেন্ট আমাকে বসতে বলে কম্পিউটারে
ব্যস্ত হয়ে পড়ল। জি.এম সাহেব চলে গেলেন। পুরো রুমে ফ্যান নেই।এসি চলছে। তানিশা বলে ডাক দিলেন চীফ
এ্যাকাউটেন্ট । আসছি স্যার বলে যে মেয়েটি সামনে এস দাঁড়ালো, তার জন্য মায়া হতে লাগল। মেয়েটি মডেলিং
না করে কেন যে এখানে পড়ে আছে, তা আমার বোধগম্য হলো না।

তানিশা আমি ফ্যাকট্রি থেকে ঘুরে আসছি। তুমি ওকে আমাকে কোম্পানী সম্মন্ধে ধরেণা দাও।
কি যেন নাম তোমার? স্যার আমার নাম সুপার্থ সিকদার। ঠিক আছে, তানিশার সাথে যাও। আমি দুপুরের মধ্যে
কাজ সেরে আসছি।

তানিশা ম্যাডাম আমাকে একটা টেবিলে বসতে বলল। আমি সিটে বসতেই, অন্য অফিসাররা আমাকে
প্রায় ঘিরে ধরল। গুনে দেখলাম আট জন। তানিশা ম্যাডাম ছাড়াও আরো একটি মেয়ে আছে। সে খুবই স্মার্ট।
আপনিতো অংকের শিক্ষক তাই না? হ্যাঁ, স্যার। সবাই হা-হা করে হেসে উঠল তানিশা ম্যাডাম সেই
হাসিতে যোগ না দিয়ে বলল-এখনে যারা উপস্থিত আছে, সবাই আপনার কলিগ। স্যার বলতে হবে না। আর এত
জড়োসড়ো হতে বসতে হবেনা।

একজন বলল-ভাই বানরের অংকটা যত জটিল। তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে বানর উঠল কিছুদূর নেমে গেল।
আবার কয়েক ফুট উঠল বানরের উঠার—-। অন্য আরেকজন কথা শেষ করতে দিলনা। “ভাই বানরের জায়গায়
বেড়াল হলে কিন্তু সহজেই উঠতে পারত। তবে বাঁশের উপর এক টুকরো ভাঁজা ইলিশ রাখতে হবে।” স্মার্ট মেয়েটি
এবার কথা বলে উঠল- ভাইয়া, উঠতে পারবে যদি ভিজে বেড়াল হয়। সবাই হেসে উঠল। আমিও যোগ দিলাম সেই
হাসিতে।

বেশ কিছুদিন কেটে গেল।আমাদের গার্মেন্টস কোম্পানীর দু’টি পোশাক কারখানা। শ্রমিকের সংখ্যা
প্রায় তিন হাজার।মাসে শ্রমিকদের বেতনই আসে সত্তর লাখ টাকা। ওভার টাইম যোগ করলে প্রায় কোটির
কাছাকাছি। মালিক কে দেখলাম সেদিন, যেদিন অফিসে গিয়ে শুনলাম বিদেশি বায়ার রা আসছে কারখানা পরিদর্শক
আমাদের অবস্থা হল পাগলের মত।

এমনিতেই রাত ৮ টার আগে বাসায় ঢুকতে পারিনা।তার উপর “বায়ার” আসলে রাতটা অফিসেই কাটাতে
হয়। সবাই গাড়ি নিয়ে কারখানার দিকে ছুটছে। কারখানা ঝকঝকে তকতকে করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এক এক
নিদের্শনা নিয়ে এক-একজন ছুটছে। আমার ডাক পড়ল মালিকের রুমে।কালো পাতলা ধরনের মানুষ। আমাকে
দেখেই বলল-তুমি নতুন? হ্যাঁ, স্যার বলে দাঁড়িয়ে রইলাম।জি. এম সাহেব এবার কথা বলে উঠল- তানিশাকে ডাক।
আর ওই কালো ব্যাগে বিশ লাখ টাকা আছে। দ্রুত যাও কারখানায়। শ্রমিকের ওভার চাইমের বিল পরিশোধ
করতে বল। কুইক। গাড়ি চলছে।তানিশা ম্যাডামকে নিয়ে আমি কারখানার দিকে ছুটছি। তানিশা ম্যাডাম আমারে
বলল-“ আজ আমার বড় বোনের মেয়ের জম্নদিন। কেক অর্ডার দিয়েছি। নিয়ে যাবার কথা আমার। বায়ার রাই
আসবে সন্ধ্যাবেলা।” আমার মনটাই খারাপ হয়ে গেল।

কারখানায় আমরা হেড অফিসে সবাই তদারকি করছি।চৌদ্দ জন শিশু শ্রমিক ছিল।তাদের বিশেষ ছুটি
দেয়া হয়েছে। নতুন পানির ড্রাম বসানো হয়েছে। কোট-টাই পড়ে দাঁড়িয়ে আছি। সন্ধ্যায় দু-জন বিদেশি ঢুকল
একজন বাঙালিকে সাথে নিয়ে। বিদেশিদের একজন যে গেন্জিটা গায়ে দিয়েছে তার চেয়ে অনেক দামী গেন্জি
আমাদের এই কারখানায় তৈরী হয়।

সময় দ্রুত কাটতে লাগল। একদিন রাস্তা দিয়ে হাঁটছি।হঠ্যাৎ সবাই যে যায় মত পালাচ্ছে। দু-টো বিকট
আওয়াজ শুনলাম। আমি দেরি না করে দৌঁড়ে পাশের গলি দিয়ে অন্য রাস্তায় ঢুকে পড়লাম। সেখানে ব্যস্ততার
শেষ নেই।কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা একসাথে বসে ফুচকা-চটপটি খাচ্ছে। একদম শান্ত পরিবেশ।
এ শহরে আমি অভ্যস্ত হয়ে পড়লাম।