টার্মিনালে বাস থেকে নেমে রিকশাওয়ালাকে ঠিকানা বুঝিয়ে দিলে সে চলতে শুরু করে। এসে থামে নির্দিষ্ট স্থানে। বাড়িটার সামনে লোকে লোকারণ্য। বোঝা যাচ্ছে ভেতরেও প্রচুর মানুষ। ভেতর থেকে আর্তনাদ আহাজারি ভেসে আসছে। আমার বুকের ভেতরটা আরও বেশি কাঁপতে থাকে। শ্বাস ঘন হয়ে আসে। বাড়ির ভেতরে যাবার শক্তি-সাহস কোনোটাই পাই না। সে চেষ্টা না করে পাশের বটগাছের তলে যাই। এখানে বট, পাকুর, বটের ঝুড়ি মিলে বেশ একটা বেদীর মতো তৈরি হয়েছে। বটগাছের একটা ডাল হেলে পড়েছে। গাছের গোড়াটা বা বেদীটা ছায়া ছায়া।
ছোটবেলায় এই গাছের ডালে ওড়নার দুই মাথা বেঁধে দিতাম ও দোল খেত আর হাসিতে কুটিপাটি হত। এখানে বসে দু’বোনে কত গল্প করেছি তার সাক্ষী এই গাছেরা। বসে পড়ি। মানুষের জটলার দিকে তাকিয়ে থাকি। এখান থেকে পিলপিল মানুষ দেখা যাচ্ছে। একের পর এক রিকশা, বাইক, সাইকেল এসে থামছে। মানুষজন নামছে। ভেতরে যাচ্ছে। এবারে একটি রিকশা থেকে নামে আমার সেজ খালা। খালু তাকে ধরে রাখতে পারছে না। আহা রে! বেদনার ঘায়ে খালা মূর্ছা যাচ্ছে। আমার মায়েরা ছয় বোন। পাঁচ খালাই বড়ো চমৎকার মানুষ। এই সেজ খালার ফুলের নামে নাম। তার গায়ের রঙ কালো। কিন্তু নাক, মুখ, ঠোঁটের গড়ন, আঁখিপল্লব এত সুন্দর! মনে হয় রবিঠাকুর খালার মতো মেয়েদের নিয়েই গান বেঁধেছিলেন, ‘কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি কালো যাকে বলে গাঁয়ের লোক’…
অথচ এই খালাকে বিয়ে দিতে নাকি আমার নানা-নানির অশ্রু-ঘামে নাজেহাল অবস্থা হয়েছিল। খালা এসেছে তার প্রথম সন্তান বেবি’র বাড়িতে। এই বেবি আর আমি একইদিনে পৃথিবীতে এসেছিলাম অর্থাৎ দুই বোনের একই দিনে বাচ্চা হয়েছিল। খালার মেয়ের নাম বেবি। মায়ের রঙ পেয়েছে। গায়ের রঙের জন্য বেবিরও বিয়ে হচ্ছিল না। হলেও সংসার হচ্ছিল না। তার ওপর আবার মা হচ্ছিল না। কত কত বিনিদ্র রাত আর অসহনীয় দিনের পরে বেবি মা হয়! কোলে সন্তান আসে, স্কুলে চাকরি হয়। কালো মেয়ের কচুরিপানার মতো টলোমলো জীবন-সংসার কিছুটা থির হয়।
এবার একটা মাইক্রোবাস এসে থামছে। একে একে উদ্বিগ্ন মুখে নারী-পুরুষ নামতে থাকে। বাসের গায়ে স্কুলের নাম লেখা। ওর স্কুলের শিক্ষকেরা এলেন। মাঝে মাঝে বাসার ভেতর থেকে বেবির হাজব্যান্ড মুন্না ভাইয়ের হাউমাউ কান্নার শব্দ ভেসে আসছে কিন্তু বেবির কোনো সাড়াশব্দ পাচ্ছি না। মরেটরে গেল নাকি! মরে যাওয়াই মনে হয় ভালো হয়। একমাত্র সন্তানের মায়েরা বুঝি মরেই যায়। চমকে উঠি। এসব কী ভাবছি! ব্যাগের ভেতরে ফোনটা বাজতে থাকে। ধরতে ইচ্ছে করে না। বেজে বেজে সেটা একসময় থেমে যায়। যাক।
উঠতে ইচ্ছে করে না। উচিত কিন্তু বাড়ির ভেতরে যেতে ইচ্ছে করে না। বেবি বা কারো মুখোমুখি হতে পারব না। গাছের নিচে ছায়াতে বসেও কেন যেন তাপবোধ হচ্ছে। কয়েকদিন আগেও তাপমাত্রা গেল বিয়াল্লিশ ডিগ্রি। মানুষ তো মানুষ, গোরু-ছাগলেরও নাভিশ্বাস উঠেছিল। দু’দিন আগে তুমুল শিলাবৃষ্টি হওয়ায় এখন তাপমাত্রা সহনীয়। আরও বাইক এসে থামছে। গলায় আইডি কার্ড আর ক্যামেরা ঝুলিয়ে সাংবাদিকরা হাজির দলে দলে। টিভি, খবরের কাগজ, ইউটিউবের রিপোর্টার। তাদের সামনে ফুটন্ত এবং নিথর নিউজ।
ক্রমশ উৎসুক সমাগম আরও বাড়ছে, কান্না সংক্রামিত হচ্ছে। ব্যাগ হাতরে সুপারি ও মৌরির কৌটা বের করে মুখে দেই। মুখটা শুকিয়ে যাচ্ছে। কাহিল লাগছে। ফোনটা বের করে হাতে নিই। অনেকেই অনলাইন আছে। কারো সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে। মুখোমুখি না হয়ে শুধু কথা বলা। আমার সবচেয়ে বড়ো খালার বড়ো মেয়ে আমেরিকায় থাকে। সে অনলাইন আছে। আমি, বেবি— আমরা যখন খুব ছোট তখন তার বিয়ে হয়েছিল। সেই বিয়েতে বেবিসহ অনেক আনন্দ করেছিলাম। নতুন বউয়ের সাথে তার শ্বশুরবাড়ি গিয়েছিলাম। ওরকম জাঁকজমকের বিয়ে এতদাঞ্চলে আর হয়নি। আপুকে ফোন দেবো? কী বলব?
আচ্ছা, আমার এক বন্ধু যে আমাকে সকল ব্যাপারে সহযোগিতা করতে চায় তাকে একটা ফোন দেবো কি? কী বলব? আমার খালাত বোনের ঘটনায় তার কি কিছু যায় আসে? আসলেই তো যার সন্তান তার ছাড়া আর কার কী যায় আসে? নিজে নিজেই চমকে উঠি। আমি এসব কী ভাবছি? কেন এসব আবোলতাবোল ভাবনা মাথায় আসছে? মস্তিষ্ক কি বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে চাইছে? মুখ তুলে দেখি আকাশে একটা চিল বা শকুন উড়ছে আর ঘুরছে।
বেবি কি আমার পর? বেবি আমার বোন, বন্ধু, আমার পরম আপনজন। ওর সন্তান? জন্মের পর ডাক্তার যাকে আমার করতলে দিয়েছিল, যাকে একটু একটু করে বেড়ে উঠতে দেখলাম, যে ছোট থেকে খালামণি খালামণি বলতে পাগল, যাকে কিছুদিন না দেখলেই আমি অস্থির হয়ে পড়ি সে আমার পর? যেকোনো উৎসব-পার্বণে, কেউ মারা গেলে, নানাবাড়ি গেলে সকলের সাথে দেখা হতো, মাখামাখি হতো। আমি থাকতাম ওকে নিয়ে। দেখতে দেখতে বড়ো হয়ে গেল। কিছুদিন আগেই শুনলাম সে এসএসসি পরীক্ষা দেবে। ফোনে বলল, ‘খালামণি বেশি বেশি দোয়া করবা’। দোয়া তো করেছি, বাবা।
ওর বাবা-মা মানে বেবি আর মুন্নাভাই আরেক স্কুলের শিক্ষক। সারাদেশে আজ রেজাল্ট হবে। তাদের স্কুলেও ফলাফল ঘোষণা হবে। তবু বেবি ছেলেকে বলেছে, ‘বাবা আজ আমি ছুটি নিই, আজ তোর রেজাল্ট’। উত্তরে বলেছে, ‘না আম্মু তুমি স্কুলে যাও। রেজাল্ট নিয়ে আমি তোমার ওখানে আসছি, আজ কিন্তু আইসক্রিম বানাবা’। বেবি কিছু টাকা হাতে দিয়েছে। বলেছে, ‘বানাব বাবা, তালা দিয়ে চলে আসিস, সাবধানে আসবি’।
রেজাল্ট হয়েছে। বেবি ছেলেকে ফোন দিয়েছে। ধরেনি। নিজের স্কুলেও ব্যস্ততা, ভেবেছে সহপাঠীরাসহ আনন্দ করছে। সবাই মোটামুটি জানত সে জিপিএ ফাইভ পাবে। তারপরও ফোনের পর ফোন দিয়েছে। কেউ ধরেনি। এরপর স্বামী স্ত্রী দু’জনে মুখ চাওয়াচাওয়ি করেছে। তারপর তারা পাশের বাসার ভাইকে ফোন দিয়েছে। তারাও কিছু বলতে পারেনি। ওর সহপাঠীর সাথে যোগাযোগ করলে জানিয়েছে, ‘আন্টি ওতো রেজাল্ট শুনেই বাসায় চলে গেছে’। বেবি আর ভাইয়া দু’জনে দ্রুত বাইকে করে রওনা দেয়। ততক্ষণে অনেকেই ব্যাপারটা জেনে গেছে। বেবিরা এসে দেখে প্রতিবেশী, বাড়িওয়ালা, অন্য গার্জেন— সবাই মিলে দরজা ভেঙে ঢুকে পড়েছে।
বাসার ভেতরে যাব কি যাব না এমন সিদ্ধান্তহীনতার মাঝে দেখি ওর সাদা বেড়ালটা জানালায় এসে মুখ বাড়িয়েছে। একলাফে জানালায় চলে যাই। বেড়ালটা গ্রিলের ফাঁক গলে কোলে আসে। এই প্রথম ওকে বুকে জড়িয়ে প্রবল কান্নায় ভেঙে পড়ি। মায়ের একটা পুরোনো জর্জেট ওড়না সিলিং ফ্যানের সাথে দোলনার মতো বাঁধা ছিল…
ইউনিফর্ম পরা একটি ছেলে বলে, ‘রেজাল্ট তো খারাপ হয়নি তাহলে?’
আরেকজন বলে, ‘নাহয় জিপিএ ফাইভ হয়নি, তাতে কি হয়েছে?’
একজন মুরব্বি বলে, ‘এই ছেলে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জুম্মায় পড়ত, সে নাকি তাহাজ্জুতও পড়ত, ক্যামনে কী?’
উপস্থিত একজন ডাক্তার দ্রুত নাড়ি ধরে বলে, ‘পাঁচটা মিনিট আগে নামাতে পারলে বাঁচানো যেত’।
আদতে নিজে না চাইলে কি কাউকে বাঁচানো যায়?
