বই পরিচিতি
বই: বাংলার নিজস্ব সেচ ব্যবস্থা (উইলিয়াম উইলকক্স)
অনুবাদ: ফারুক ওয়াসিফ
প্রথম প্রকাশ: জুন ২০২১
প্রকাশন: ডাকঘর
প্রচ্ছদ: রাজীব দত্ত
পৃষ্ঠা: ৯৬
মূল্য: ৩০০টাকা (হার্ডকভার)
২০০ টাকা (পেপারব্যাক)
উৎসর্গ: ভুল নদী শাসনের শিকার কৃষকদের প্রতি

আলোচনা:
নদ-নদীময় বাংলাদেশে ‘বন্যা’ খুব পরিচিত একটি শব্দ। যে শব্দের সাথেসাথেই চোখে ভাসে নদীতীর কিংবা নিম্নাঞ্চলের মানুষের ভোগান্তি এবং ব্যপক ক্ষয়ক্ষতি। কিন্তু এই অভিশাপের বন্যা হতে পারতো আশীর্বাদ! কীভাবে? এটা বুঝতে হলে নদ-নদী, খাল-বিল এবং জলপ্রবাহ সম্পর্কে প্রথমিক জ্ঞান থাকা জরুরী। আজকের একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে নিশ্চয় কোন বিষয়ে গতানুগতিক ধারায় কিছু বললেই গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না। প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করবার দক্ষতা এবং বিভিন্ন এঙ্গেল থেকে গভীর বিচার-বিশ্লেষণ। যাইহোক এ বিষয়গুলো ব্যক্তিগতভাবে সুগভীর অনুধাবন করতে যে দুটো বই বিশেষ ভাবে সহায়তা করেছে তা হলো ফারুক ওয়াসিফ কতৃক অনুবাদকৃত উইলিয়াম উইলকক্সের “বাংলার নিজস্ব সেচ ব্যবস্থা” এবং ড. তুহিন ওয়াদুদ রচিত “নদী সুরক্ষায় দায়িত্বশীলতা”। “বাংলার নিজস্ব সেচ ব্যবস্থা” -এর আলোকেই কিছু বিষয় আলোচনা করা যাক—
আধুনিক সেচ ব্যবস্থার জনক হিসেবে পরিচিত উইলিয়াম উইলকক্স। একজন বৃটিশ প্রকৌশলী। যিনি প্রথম আসোয়ান বাঁধের নকশা করেন। মিশর, দক্ষিণ আফ্রিকা, তুরস্ক ও ইরাকে সেচব্যবস্থা চালু করেন। উল্লেখ্য যে, তুরস্ক থেকেই ইরাকের প্রাচীন ব্যবিলনের ৩৫লক্ষ একর জমি ফোরাত নদীর সেচব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসেন। ১৯৩০সালে তার বিস্তৃত অভিজ্ঞতার আলোকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪টি বক্তৃতা করেন। লেখক,সাংবাদিক ফারুক ওয়াসিফের প্রাণোজ্জ্বল অনুবাদে ওই চারটি বক্তব্য গ্রন্থিত হয়েছে “বাংলার নিজস্ব সেচ ব্যবস্থা” শিরোনামে।
পৃথিবীব্যপী আবহমানকাল থেকে নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে সমাজ-সংস্কৃতি। এ অঞ্চলও তার ব্যতিক্রম নয়। প্রায় দুইশত বছর ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের ইতিহাস কারোর অজানা নয়। শাসন এবং শোষণের নিমিত্তে উপনিবেশিক উন্নয়নে চিড়ে-চ্যাপ্টা পুরো দক্ষিণ এশিয়া। এই ঔপনিবেশিক উন্নয়ন পরিকল্পনার সরাসরি বিরোধিতা করেছেন উইলকক্স। একইসাথে তিনি তার বক্তব্য চারটিতে যথাযথ যুক্তিতর্ক, বিশ্লেষণ এবং উদাহরণের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াটিকে তুলে ধরেছেন। আরো উঠে এসেছে নদীর ভৌগলিক বৈশিষ্ট্য, কৃষিজউৎপাদন, রোগব্যাধি অর্থাৎ নদীকে কেন্দ্র করে আবর্তিত প্রাণ-প্রকৃতির কথা।
সেচই হলো পৃথিবীর আদিমতম ফলিত বিজ্ঞান। অববাহিকা-সেচ যেমন মিসরের জন্য, স্থায়ী-সেচ যেমন ব্যাবিলনের জন্য একদম মোক্ষম ছিল; তেমনি বাংলার জন্য উপযুক্ত ছিলো প্লাবনসেচ ব্যবস্থা। বর্ষায় নদী ফুলেফেঁপে উঠলে কৃষকেরা খাল কেটে সেই জল কৃষিজমিতে ঢুকিয়ে দিতেন, সেই জলের সাথে ভাসমান মিহি পলিও জমিতে ছড়িয়ে যেত। আর অপেক্ষাকৃত মোটাদানার বালি স্রোতের টানে সাগরের দিকে বয়ে যেত। উইলকক্স এই ব্যবস্থার নাম দিয়েছিলেন প্লাবন সেচ বা ওভারফ্লো ইরিগেশন। ঐতিহ্যিক ভাবে এ অঞ্চলের মানুষের পরস্পরের প্রতি ভালোবাসার যে প্রবণতা, সেটারও উৎপত্তি এই প্লাবন সেচ ব্যবস্থা বা উপচানো খালগুলোর ঘোলা পানি বন্টনের ব্যবস্থা থেকে। কারণ জমি থেকে জমিতে পানি যাওয়ার এ বন্দোবস্তের মাধ্যমে প্রতিবেশীর জমিটাও নিজের জমি হিসেবেই পরিগনিত হত।
তিনি মনে করেন ভাগীরথীসহ সব শাখা নদীগুলি আসলে সেচের প্রয়োজনে কাটা খাল। দামোদর অববাহিকায় মূলধারাটি ছাড়া বাকি সাতটি মজা শাখা নদীও তাই। তার মতে সেচখাল কাটার এই প্রকৌশল এদেশে এসেছিলো মধ্যপ্রাচ্য থেকে। পারস্য ও আরব দেশে ‘কান’ কথাটির অর্থ খনন করা আর সেই জন্যই কাটা খালগুলিকে বলা হত কানা নদী। আর এই কানা ও মরা নদীগুলোই হলো সমগ্র বাংলার একমাত্র জীবন্ত ও চক্ষুষ্মান সেচ ব্যবস্থার উদাহরণ। ১৮শতকে মুঘল সাম্রাজ্যের ভাঙনের আগের সময় পর্যন্ত এ অঞ্চলে প্লাবন সেচ ব্যবস্থা বহাল ছিলো। সেই সময়গুলোকে প্রাচীন সেচ ব্যবস্থার সোনালি দিনগুলি আখ্যা দিয়েছেন উইলকক্স। এরপরেই এ অঞ্চলের সেচ ব্যবস্থা মারাত্মক বিপর্যয়ের মধ্যে পরে।
অতীতে দামোদর বর্ধমান জেলায় অন্তত আটটি শাখায় ভাগ হতো। এই নদীগুলোর পথ ধরেই বন্যার জল নিম্ন দামোদর অববাহিকাকে প্লাবিত করত। সেই জলের স্রোতে ভেসে আসতো নানাধরণের মাছ, ধুয়ে যেত মশার লার্ভা। দুদিন পর বন্যার জল নেমে যায় আর জমিতে ফেলে যায় উর্বর মাটি। কেবল মাটির উর্বরতা রক্ষা এবং ম্যালেরিয়া ঠেকানোর জন্যই এই কর্দমাক্ত পানির দরকার নয়, ক্ষতিকর কাশবনের বিস্তার ঠেকানোর জন্যও এর প্রয়োজন। নইলে পড়ে থাকা জমি কাশবনে ভরে গিয়ে অনুর্বর হয়ে যায়। কিন্তু সাহেবদের চোখে দামোদর বাংলার দুঃখের নদী,কারণ বন্যা হলে রাজস্ব সংগ্রহে ব্যাঘাত ঘটে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ১৮৫৫সালে হাওড়া থেকে রানীগঞ্জ পর্যন্ত উঁচু বাঁধের উপর দিয়ে অপরিকল্পিত রেলপথ নির্মিত হয়। আর এর পরেই বন্যার প্রকোপ বাড়ে, ম্যালেরিয়া মহামারি আকার ধারণ করে এবং কৃষি উৎপাদন কমে যায়। শুরু হয় দুর্ভিক্ষ, অনাহার ও ম্যালেরিয়ার মহামারি। ১৯১৭ সালে একই ভাবে তৈরি হয় হাওরা-বর্ধমান কর্ড লাইন।
ইংরেজ শাসনামলে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে রেলপথ এ অঞ্চলে উল্লেখ্য। রেল লাইনের সুরক্ষা এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য শক্তপোক্ত বাঁধ নির্মান আপাত দৃষ্টিতে আশীর্বাদ মনে হলেও এ বাধগুলো শাখানদী গুলোকে মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করে। সেইসাথে নষ্ট হয় কৃষির সাথে নদীর আন্তসম্পর্ক। পরবর্তীতে কৃত্রিম সেচ ব্যবস্থায় পানি সরবরাহ সম্ভব হলেও তা পলি সমৃদ্ধ নয়। যার প্রভাব উৎপাদনে দৃশ্যমান হয়। উইলকক্স বলেন, “সারাদেশে গঙ্গা ও দামোদর নদী থেকে আড়াআড়িভাবে বেরুনো খাল দিয়ে বিন্যস্ত ছিলো। আর এসব খাল দিয়ে কমপক্ষে সত্তর লাখ একর জমি সেচের আওতায় আনা হয়েছিলো।” আর এইসব খাল-ই আজকের মরা নদী। ১৯৩০সালে দেওয়া বক্তব্যে বাঁধ কেটে দিয়ে ৭০ বছর আগের ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার প্রতি বার বার জোড় দিয়েছিলেন। তিনি আরো বলেন, “আমাদের যা কিছু প্রয়োজন তা প্রাচীন যুগের মানুষেরা করে গেছে। এখন কেবল তাদের মতো দায়িত্বশীল ভূমিকা আমাদেরই গ্রহণ করতে হবে এবং আবার পানি ব্যবস্থাপনাকে কার্যকর করে তুলতে হবে।
