কথাগুলো শব্দগুলো অক্ষরগুলো সময় পেলে দীর্ঘশ্বাসে অনুবাদ করি। পিপাসা তীব্র হলে গ্লাসপূর্ণ অন্ধকার পান করি রাতে।
১
অন্তত এক হাজার রাত্রি আমি না ঘুমিয়ে কাটিয়েছি এই মহানগরে। তাতে কী হয়েছে? কেউ কেউ তার কিছু মনে রেখেছে। আমি মরতে পারি—এটাই অবাক করা ঘটনা ছিল। যারা সে দুর্ঘটনার দায় নিতে পারে, তাদের কেউ কেউ বস্তুত পেশায় কলমশ্রমিক। কিছু মানুষ পরিচিত হয়েছিল বটে, সাময়িক বিরতিতে, আর কিছু অপেক্ষা করে করে শান্তি পেতে। তারা এখন নদীর জলে বয়ে গেছে কোনও শ্রাবণে অনিবার্য কালের সমীপে।
আমি অন্তত এক দশক স্মৃতিনাশক চেতনায় লালন করতে পারিনি তাদের। নিশ্চয়ই ভুলে গেছি কিছু দরকারী ওষুধের নাম। বার বার জিজ্ঞাসা করে খুঁজে পেলে আলোচনা হবে আলাপ ও আড্ডায়।
২
মহানগরে কিছু পাতিকাক গলাভাঙা স্বরে মাঝে মাঝে দল বেধে ডাকাডাকি করে। বিশেষত জাতীয় প্রেসক্লাব উদ্যানে। কিছু তরুণ সাংবাদিকের প্রশ্ন—ওরাও কি সংবাদ সম্মেলনে এসেছে? কী বক্তব্য তাদের? শোনা যেতে পারে। ফোটোগ্রাফারদের মনোযোগ পেয়ে বসে কখনো কখনো।
হঠাৎ কখনো তাদের গুরুতর শোকসভা অনুষ্ঠিত হতে দেখি। তখন মাটিতে নেমে এসে গোল হয়ে হাটাহাটি করে। যদি কেউ মরে যায় তাদের। কাকের শোকসভা বিবিধার্থ সংবাদগুরুত্বের ইংগিত, সাংবাদিকেরা তার মর্ম জানে।
মনখারাপ হয়, যখন শুনতে পাই— অহরহ রাজধানীতে কাকের শোকসভা বসেছে। এই তো কিছুক্ষণ হলো— খবর এলো, একটি কাক উড়ে গেল পরপারে—কিছুদিন আগে প্রেসক্লাবে, আহত হয়েছিলেন সংবাদ সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়ে।
৩
ডিয়ার ট্রুথম্যান, আপনি জেগে থাকলে আমি ঘুমোতে যেতে পারি না। না পারি বিছানায় ও ভর রাখতে পাশ বালিশে। কী এক ভাবনায় চিন্তার পাহারায় উঠে বসে থাকি।
ট্রুথম্যান, আমাদের বিবেচনায় ভয় নেই কোনও, চেতনায় তাড়িত বোধ করি।
৪
কয়েক পৃষ্ঠা অন্ধকারে কালো কালিতে লেখা, আমার ঠিকানা ধরে নিয়মিত ডাকে আসছিল। তার কিছু চোখের জল, যুগব্যাপি ভাষায় অনুবাদে লিখে গেছি।
এমন পাঠ-উপভোগ্য নিদারুণ চিঠি নিয়মিত ডাকে আসছিল।
তার কিছু শিশির-জল সংরক্ষিত আছে চায়ের কাপে, দক্ষিনের জানালার পাশে। সাবধানে দেখে নিও কখনো একা। তবু পড়তে যেও না। প্রবল পিপাসা পেলেও চুমুক দিও না। রবীন্দ্রনাথ এই দ্রক্ষারস পান করে কিছুদিন বুদ হয়ে বসে ছিলেন পাশে। সে চিঠির অক্ষরগুলো মধ্যরাতে কষ্ট করে পড়তে যেও না। —প্রিয় করবী, সাবধানে থেক।
৫
দেয়ালজুড়ে, দেয়াল গড়িয়ে রক্ত ঝরছে, তাকে কি তুমি ফুল ভেবেছো? তাহলে ভুল করেছো—এটুকু জানি!
৬
লালরঙ জলে ধুয়ে গেলে নীলরক্ত দেয়ালে এখনো গড়ায়। —করবী?
দেয়াল প্রসঙ্গে আমি কিছু নীলরঙা রক্ত দেখেছি। গড়িয়ে গড়িয়ে তারা প্রাচ্যকলার ছবি এঁকেছে। তাই, প্রেসক্লাব থেকে হেটেই আমি মাঝে মধ্যে পুরনো কাগজের খোঁযে নীলক্ষেতে যাই।
৭
ভেসে আসা মেঘ থেকে ঝরে পড়ছে ঘাম অবিরাম, স্মৃতির দেয়ালে;—বরফ শীতলতম লীন।
—ধুয়ে যাচ্ছে রঙগুলো বের হচ্ছে চুনকাম রেখা ও জ্যামিতি বিভিন্ন কৌণিকে— নিকশিত প্রকাশে এই জলের প্রপাত—।
এক ঝলক রোদ্দুর পেলে চিক চিক করে হেসে ওঠে— কোনও উৎস হতে যেন প্রুকাশিয়ান ব্লু।
—আচ্ছা করবী, ব্রিটিশ কি এখনো নীলক্ষেতে চাষ করে যায়?
৮
পাখিরা ঘুমোতে যাক। সারাদিনের উড়ন্ত ডানা ভারি হয়েছে।
বরং ফুলের প্রসঙ্গ নিয়ে হোক আলোচনা। শিশিরকে ডেকে বোলো আজ যেন রাত জাগে না।
প্রিয় করবী, এক গ্লাস জল হবে? বাম অলিন্দে ঈষৎ যন্ত্রণা, আজ তবে থাক!
৯
আংশিক ভগ্নাংশে সারি সারি দুঃস্বপ্নের অধিকার মিছিল। ঘুমের অবর্তমানে তন্দ্রায় আচ্ছন্ন বোধ করি বটে। দেখেশুনে ভয় পেয়ে তন্দ্রা ছুটেছে।
দুঃস্বপ্ন এক্সপ্রেস ছুটে চলে দুরন্ত ট্রেনের গতিতে দূরপাল্লায়। মস্তিষ্ককোষে জমে থাকা অন্ধকারে ঘুনপোকা পাহাড় কাটে রোজ।
প্রিয় করবী, নিশ্চয়ই অসম্ভবেও ভালো থাকা যায়, বর্ণনার অতীত কিছু বাস্তবতা আছে এই প্রকৃতি ও সত্ত্বায়।
১০
জেগে আছে এখনো রাতের গভীরতা মাকড়সার জালে। ঝুলে আছে অন্ধকার চারপাশ ঘিরে। ভোর হলে ঘুমোতে যাই প্রচণ্ড কোলাহলে। তন্দ্রা ছুটে যায় দুঃস্বপ্নের কবলে বার বার।
তোমাকে মিনতি করি, অবরোহী লয়ে ঘুম এলে ডেকে তুলো না— করবী, তোমাকে কবিতা শোনাবো না হয় কাল—!
১১
—এক যুগ ধরে? —তার চেয়ে কিছুটা বেশি? —হতে পারে। —প্রতিদিন একপৃষ্ঠা অন্ধকার অনুবাদ করে দেখেছো? কালো চোখে অন্ধকার খুঁজে খুঁজে দেখো— কিছু পেতে পারো—নির্দিষ্ট দূরত্বে থেকে দেখো!
—কাছে যেও না খুব, দেবতার ধ্যান ভেঙে যাবে।দীর্ঘশ্বাসের উষ্ণতায় ভিজে যেতে পারো! —ঝুঁকিরও সামান্য কিছু আছে, বিবেচনা করে দেখেছি!
প্রিয় করবী, শেষ রাতে গড়িয়ে গেল। আর এক প্রহর বাকি—!
১২
তারা কেউ ঠিকঠাক শুরু করে। তবে ভালো করে মেনে চলেন রূটিন ও প্রথা, এটা নয় তাদের চারিত্রিক দুর্বলতা।
কিছু মানুষ হই-হট্টগোল ভালোবাসে। তারা সবকালে থাকে আশেপাশে।
দেখেশুনে চলবেন আপনারা!
১৩
পরিত্যাগে কেন পরিতাপ ছড়ালে? তুমি জানো না, তুমি দেখনি? তোমার স্বভাবে কত কালো অন্ধকার? মানুষ কি মরে, মরেছিল কি এতো সামান্যে কেউ? খুঁজে দেখনি মন পোড়ে দেহে কী গভীর মনস্তাপে?
চৈত্রের রূপ দেখতে কোথায় কেমন ছিল? শুধু দেখছো মাঠে ফসলের পুড়ে যাওয়া? তাতেই যদি কান্নায় থাকে এত ব্যাকুলতা? মনে রেখ, এ জানাটুকু খুব সামান্য ছিল।
মানুষ ও মন এতটুকু শুধু নয়। এই মনস্তাপ ভীষণরকম উত্তাপিত হলে এই মনের প্রকাশ মহাকাশ বিস্তারিত।
১৪
অক্ষর নীল হলে কেমন দেখা যায়? জিজ্ঞাসা করেছিল সেমিনার শেষে— লালে ও হলুদের কিছু দিন কিছু ছবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলে?
নিশ্চয়ই মুখোমুখি হলে দারুণ আড্ডায় কাটে বেলা। —এই তো সে দিন, স্মৃতি সম্মেলনে ফিরে যেতে দেখা হয়েছিল পথে— শীত ছিল তীব্রতর— , রোদ্দুর কাপছিল একলা তখন। —করবী, এখনো কি সে পথ দিয়ে হাটে কেউ, গড়িয়ে গিয়েছে যে বেলা।
আগামী চিঠিতে লিখো তার কিছু।
১৫
—রে, —শয্যা, শান্তির বনতলে ছিল—? —ছিল মনস্তাপে, বনবাসে— জনক নন্দিনী!
—সে বিষাদ বর্ণিত আছে মেয়ে, বিশদ রামায়ণে, রে—?
—তুমি মেয়ে, পড়েছিলে লোভে, সীতা— মানোনি লক্ষ্মণরেখা! রে—; পথ!
