অস্কার ওয়াইল্ডে’র ‘নাইটিংগেল ও একটি গোলাপ’

সেই ছেলেটি, আহা, সেই ছেলেটি অধ্যাপকের মেয়েটির জন্য রক্তগোলাপ নিয়ে যে স্বপ্ন রচনা করতে চেয়েছিলেন, তা মুহূর্তই ভেঙে পড়েছিল। অধ্যাপকের মেয়েটি গোলাপকে গুরুত্ব দেয়নি, দিয়েছিল-মার্কুইসের ছেলের জহরত, অর্থবিত্ত, সামাজিক মর্যাদা। মেয়েটিই বলেছিল, আকুল প্রেমিকটি যদি তাকে একটি রক্তগোলাপ এনে দিতে পারে আসন্ন নাচের আসরে তারা একসঙ্গে নাচবে। প্রেমিক ছেলেটির কি আহ্লাদ। সেই একটি গোলাপের জন্য প্রাণপাত করে কিন্তু কোথাও গোলাপ পাওয়া যায় না। ছেলেটি দুঃখে ভেঙ্গে পড়ে। ছেলেটির দুঃখ দেখে একটি নাইটিংগেলের মন কেঁদে ওঠে। নাইটিংগেলটি এর আগে এ রকম খাঁটি প্রেমিক আর দেখেনি; বুলবুলিটি ভাবে ছেলেটির জন্য ঝুঁকি নেওয়া যায়। জগতে মানুষের স্বপ্ন অনেক বড় আহ্লাদি বাসনা হয়ে আসে, আর স্বপ্ন যদি ভেঙে যায়, সেই ভাঙা স্বপ্ন রাখার জায়গা পাওয়া যায় না। তখন দুঃখে ভেঙে পড়ে মন, জগত, সময়।

ইংল্যান্ড যে কত বর্বর একটি রাজ্য ও সাম্রাজ্য ছিল, ইতিহাস তার সাক্ষী। যাকে আমরা আজকে আধুনিকতার পরাকাষ্ঠা বলেছি, সেই খ্রিষ্টীয় ইংলন্ড আধুনিকতা পার হয়ে বেশিদূর এগিয়ে যেতে পারেনি। খ্রিষ্টীয় ইংরেজদের মন তখনও আধুনিকতা ছুঁতে পারে নাই। সামাজিক নানা ধরনের জাঢ্য বিকাশের মধ্য দিয়ে তাদের বিকাশ হচ্ছিল। জেফ্রি চসারের- ক্যান্টাবেরি উপখ্যানে খ্রিষ্টীয় ইংলন্ডের সমাজ চিত্র আমরা দেখি কি বিচিত্র-পরিণত-অপরিণত বাস্তবতায় ভরপুর। পরবর্তীকালে খ্রিষ্টীয় ইংলন্ড খ্রিষ্ট্রিয় ম্যরালিটির কোন মূল্যবোধের ধার ধারে নাই। তাদের মধ্যে যখন যেটা নগদে লাভ মনে হয়েছে তাকে ধর্ম করে নিয়েছে, তাকেই জেসাসের বাণী বলে চালিয়েছে। এ রকম প্রতারক আধুনিকতার মধ্য দিয়ে যে প্রজন্ম বড় হবে, তাদের মধ্যে ম্যরালাটির চেয়ে লোভ-লালসা- অহংকার বড় হয়ে দেখা দেবে, ইংলন্ডেও তাই দেখা দিয়েছিল। সেই যুগে নারী মন আরও বেশি অবিকশিত ছিল, বর্বরতার চূড়ান্ত সীমায় স্থিত ছিল। খ্রিষ্ট্রিয় ম্যরালিটির যে বর্বরতা তার থেকে তৈরি হয়েছে অধ্যাপকের মেয়েটির মনও। সুতরাং মেয়েটি যখন অচেতনে সুখের বুকে ঝাঁপ দেওয়ার জন্য তৈরি, তখন সচেতনে ছেলেটির দুঃখ পেতে হবে। একটি গোলাপের জন্য তার দুঃশ্চিন্তায় হৃদয় ভেঙে যায়। নাইটিংগেল- ছেলেটির অজান্তে ছেলেটির প্রেমকে বাঁচাতে একটি রক্তগোলাপের জন্য নানা স্থানে গোলাপ বৃক্ষের কাছে যায়। কিন্তু রক্তগোলাপ এত সহজে পাওয়া যায় না। তার জন্য দিতে হয় নজরানা, বুকের তাজা রক্ত। ভালোবাসার জন্য গোলাপ ফুটাতে গিয়ে আমরা দেখি-ছেলেটির বদলে নাইটিংগেলটির এক দুঃখময় পরিণতি ভোগ করতে হয়, গোলাপ ফুটানোর পরও ছেলেটি প্রেম পায় না, গোলাপ ফুটানোর এত রক্তাক্ত বিষয়টি দেখেনি ছেলেটি, গোলাপ পেয়েও ছেলেটি যে ভালোবাসা পাই নাই সেটি দেখেনি নাইটিংগেলটি, মানব ও পাখি জীবনের কি নির্মম ট্রাজেডি। একটি রক্তগোলাপের জন্য নাইটিংগেল গান শুনাতে থাকে যতক্ষণে না নাইটিংগেলের মৃত্যু হয়। নাইটিংগেল একটি সংবেদনশীল মানব জীবনের জন্য একটি পাখি জীবনবরবাদ করে দেয়। গোলাপ গাছটির শর্তও ছিল এই রকম, যে রক্তগোলাপ ফুটবে তবে, তার জন্য নাইটিংগেলের মরতে হবে। শেক্‌সপিয়রের ‘মার্চেন্ট অব ভেনিস’ এর এক কেজি মাংসের মত। দুটো ঘটনাই প্যাথেথিক। নাইটিংগেল সিদ্ধান্ত নিলেন, তাই সই। অবশেষে অনেক রক্তাক্ত যাতনা সয়ে গোলাপ ফুটলো, নাইটিংগেলটির মৃত্যু হলো। ছেলেটি জানালার দিকে চেয়ে দেখে, অবাক বিস্ময়! তার চোখের সামনেই একটি লালগোলাপ ফুটে আছে। গল্পটি লেখা হয় উনবিংশ শতাব্দীতে, এর পূর্বে এমন ধারার গল্প লেখা কারো পক্ষে সম্ভব ছিল না। কেননা, গল্প সময়কে ডিমান্ড করে। প্রচীন যুগের গল্পের এক ধরনের বুনন, সামন্তীয় যুগের গল্পের বুনন আরেক ধরনের। সামন্ত-পুঁজিবাদ-অবক্ষয়ের যুগে আরেক ধরনের হতে বাধ্য। নাইটিংগেল ও একটি গোলাপ ইংলন্ডে শিক্ষিত বুর্জোয়ার বিকাশের সময়ে রচিত সামন্ত শ্রেণির গল্প। কিন্তু ক্লাসিক। চিরায়ত মানব বোধ ও সত্তার অপরিহার্য এক বিষয়কে সাজিয়েছেন অস্কার ওয়াইল্ড। প্রেমিকটি জানে না একটা গোলাপের জন্ম কি করে হয়, মেয়েটিও। তেমনি করে মানবজাতি জানে না, কি করে জীবনর স্বপ্ন নির্মিত হয়। নির্মাণের গল্পটি কষ্টকর হলেও মানুষ শুধু ভাঙনের গল্প নিয়ে বেদনায় মথিত হয়।

গল্প ও বাস্তবের প্রেমিক ছেলেটি নাইটিংগেলের সংবেদনাময় মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি গোলাপ পেল, সে যেন হাতে স্বর্গ পেল। কিন্তু প্রেমিক ছেলেটি জানত না, গোলাপ ফুটানোর ইতিহাস- জানত না অধ্যাপকের মেয়েটিও। সে যথারীতি রক্তগোলাপটি নিয়ে প্রেমিকের সামনে দাঁড়ালো, বললো- প্রিয়ে তোমার কথা মত রক্তগোলাপ নিয়ে এসেছি। তখন মেয়েটি ছেলেটির চোখে চোখ রেখে বিস্মিতভাবে বললো- রক্তগোলাপ! ‘আমার জন্য মার্কুইসের ছেলেটি হিরা-জহরতের রিং পাঠিয়েছে’। আর তুমি একটি রক্তগোলাপ! মেয়েটি গোলাপটি ছোঁড়ে ফেলে দেয়। ছেলেটি ঘটনার আকস্কিতায় কিংকর্তব্যবিমূঢ়। দুঃখে কষ্টে আঘাতে জর্জরিত হয়ে সে গোলাপটি কুড়িয়ে নিয়ে কুচি কুচি করে ফেলে। সিদ্বান্ত নিল মানবজাতির আবেগের বন্ধনে সে আর নিজেকে জড়াবে না। মার্কুইসের ছেলে, অধ্যাপকের মেয়ে আর প্রেমিক ছেলেটি সমাজটা কল্পনা করুন। একটি গোলাপ ফুটাতে জীবনের কত কি বিসর্জন দিতে হয়। ওয়াইল্ডের গল্পের নৈতিক শিক্ষা, মেয়েদের একবাক্যের কথা কত কি উলটে-পালটে দেয়। মনের ভুবনে-মনোজগতে নামে ধ্বস।

ইংলন্ডের সমাজ বলুন, আমাদের সমাজ বলুন, আমরা অচেতনে বহন করি যে হীনমন্যতা সেই হীন- দীনতাকে প্রবলভাবে প্রকাশ করি। সেই প্রকাশ এমন নির্মম তা শুধু মনোজগতকে নয় বাস্তব জগতকেও ধ্বংস করে ফেলে। গোলাপের চেয়ে পদ ও পদার্থের মূল্য আমাদের সমাজে সর্বত্র-সব সময় বেশি। বেশি বলে সুন্দরকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে আমরা দেরি করি না। আমাদের মন এমন অসুর- অজ্ঞতায় ভরা, জাট্য, সিলমোহর মারা, স্বার্থের মোম দিয়ে আটকানো- একটি কথার অথৈ অনন্ত ঝিমিয়ে দেয় তাজা মন। এই এত বিরাট বিষয়, ফুল ফুটানো, দৌড়ে গিয়ে নিবেদন করা, পাখির রক্ত দেওয়া, মৃত্যু সব এক মার্কুইসের ছেলের হিরের আংটিতেই লুপ্ত হয়ে গেল? মার্কুইসের ছেলের এই পদার্থটি আসলো কোথায় থেকে, নিশ্চয় হিরের খনি থেকে, হিরের খনিতে কাজ করে কারা, দাসেরা। অধ্যাপকের মেয়েটির মনোবাসানায় যখন মূল্যবান পদার্থই উজ্জ্বল, সেখানে রক্তগোলাপের কি মূল্য। দাসদের শ্রমের বিনিময়ে যে পদার্থ বাজারে আসে সেই পদার্থই তার কাছে মূল্যবান। একটি আংটিতে হাজারো দাসের রক্ত লেগে থাকে। সেই রক্তের দাগ শুকানোর আগেই এটি উপভোগ করে ভোগবাদী মানুষ।

আর একটি রক্তগোলাপে একটি পাখির সংবেদন, একজন সংবেদনশীল প্রেমিকের হতবিহ্বলতা, আবেগের রেশতা। আমাদের নারীরা যেদিন পদার্থকে ‘পদার্থ’ হিসেবে জানবে সেদিন প্রেমিক মূল্য পাবে। যেদিন জানবে পদার্থ তৈরি করতে মানুষের দাস হতে হয়, দাস কেন হতে হয়, দাসের শ্রম কি, জীবন কি? তাদের মানুষ হিসেবে বুঝতে শিখবে সেদিন নাইটিংগেলের ভালোবাসার উদ্বোধন হবে। অর্থাৎ যেদিন নারীরা মানুষ হবে, মানুষ হতে চেষ্টা করবে, সেদিন আকুল প্রেমিকের কূল হবে। সভ্যতার বিকাশের সূত্র থেকে আজ পর্যন্ত নারীরা নারী, পুরুষরা প্রবলভাবে পুরুষ। শুধু প্রেমিকই আলাদা।

তাই একজন প্রেমিককে মানুষের খুঁটিনাটি আধেয়কে বিশ্লেষণ করে আশ্রয় নিতে হয় দর্শনে। প্রেমিকটিও শেষ পর্যন্ত দর্শনে মনোনিবেশ করে। কেননা, দর্শনের ভেতর যে জীবন তার মধ্যে বিশেষ থেকে সামন্যকরণের যে প্রক্রিয়া, বা সামান্য থেকে বিশেষের যে প্রবোধ তা জীবনের আর কোন বিদ্যায় পাওয়া যায় না। বেঁচে থাকতে হলে তাই তার দর্শনে ফিরে আসতেই হবে। জগতকে বদলে দিতে হলে দর্শন দরকার, জগতকে ব্যাখ্যা করতে হলেও দর্শন দরকার। তাই প্রেমিকটি অনেক বিপর্যয়ের পথ পাড়ি দিয়ে আশ্রয় খোঁজে নেয় দর্শনের জগতে। কেননা, এত বড় আঘাত তাকে সহ্য করতে হলে-দর্শনের ভেতর দিয়ে সহ্য করতে হবে, দর্শনের ভেতর তাকে দাঁড়াতে হবে। অস্কার ওয়াইল্ড কি অসাধারণভাবে ইংলন্ডের সমাজের বিকাশের ধারাকে আমাদে সামনে দাঁড় করিয়েছেন। একটি সমাজের অবকাঠামো বদল মানে সেটি উন্নয়ন বা রুচির পরিবর্তন নয়, সেটি শুধু অবকাঠামোরই পরিবর্তন। তাকে পরিবর্তিত হতে হয় ভেতর থেকে, ইউরোপিয় সমাজের অবকাঠামো পরিবর্তন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার মনোকাঠামোর বদল হয় নাই। সে সামন্ত যুগেও বর্বর ছিল, পুঁজির ঘনায়মান প্রাকপুঁজি যুগেও ছিল বর্বর। পুঁজির বিকাশে যে নতুন সমাজ বর্ধিত হচ্ছে সেখানে সে তার বর্বরতাকে বিস্তৃত করেছে নতুন রূপে। মেয়েটির হৃদয়হীনতা যে পরচিয় অস্কার ওয়াইল্ড দিয়েছেন তাই সবচেয়ে বড় উদাহরণ। আমাদের প্রত্যেক তরুণতরুণী পুঁজির এই বিকার মানসিকতার শিকার।