শোন অন্য এক যুগের অন্য এক মহাদেশের বার্তা
শোন সুদূর আফ্রিকার বার্তা আর তোমার রক্তের গান
(লিওপলদ সেদর সেঙ্গর, অনুবাদ, মঞ্জুষ দাশগুপ্ত, বিশ শতকের ফরাসি কবিতা, আটজন কবি, সম্পাদনা- পুস্কর দাশগুপ্ত, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য কালক্যুতা)
Ecoute le message du printemps d'un autre age d'un autre continent
Ecoute le message de l'Afrique lointaine et le chant de tonsang
(-Leopold Se`dar senghor)
এ জগতে ইতিহাস রচনার অধিকার একমাত্র বিজয়ী পক্ষের নয়। নিপীড়িত জনের রচিত ইতিহাসও কোন কোন ক্ষেত্রে মহত্তর হয়ে ওঠে। (আলেক্স হেলি-শিকড়ের সন্ধানে, অনুবাদ, গীতি সেন, পৃষ্ঠা- ২৪০)
'যতবার মনে পড়ে চাবুকের শব্দ, হিম হয়ে আসে রক্ত, মনে পড়ে যায়, দাসবাহী সেই জাহাজগুলোয় নির্মমভাবে পিষে মেরেছিল আমাদের আত্মাকে'
(রাস্তাফারাই, রেগেও কাজী মুনতাসির বিল্লাহ, বব মার্লি, ÔSlave drivers: সংহতি, সমগীত, ফাল্গুন ১৪১৮, ফেব্রুয়ারি-২০১২, ঢাকা, বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা:১৬)
'আমাদের লুটেছিল প্রাচীন লুটেরা, বেচেছিল সদাগরী জাহাজের কাছে'
(রাস্তাফারাই, রেগেও কাজী মুনতাসির বিল্লাহ, বব মার্লি, প্রকাশক: সংহতি, সমগীত, ফাল্গুন ১৪১৮, ফেব্রুয়ারি-২০১২, ঢাকা, বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা: ১৪)
আমেরিকার দাস বাণিজ্যের সাহিত্যিক বিশ্লেষণ, বাস্তব ইতিহাস, ব্যাখ্যা-রূপ-অরূপের ঘটনা নিয়ে লেখা শেকের সন্ধানী উপন্যাস 'দি রোডস'। এ এমন এক উপন্যাস যেখানে রক্তের স্পন্দনই সত্য, যেখানে প্রাণের আকুলতাই দুঃখের, ক্ষরণের নোনা জল। প্রাচীন দাস প্রথা থেকে নতুন ইউরোপের দাস বাণিজ্য কত বেদনাদায়ক তা ভাষায় প্রকাশ কার যায় না। শিল্পের উৎস থেকে মানবজাতির আজকের আধেয় পর্যন্ত এই রক্তক্ষরণ কোনো মাপকাঠি দিয়ে পরিমাপযোগ্য নয়। মানুষের ভাষা সৃষ্টি হওয়ার পর- মানুষের ভাষার দহন এমন করে গোমরে গোমরে আর মরে নাই। এ এমন এক বেদনা যার ভারে মুখের ভাষাও ভুলে যেতে হয়, হৃদয়ের অনুরণনে সে ভাষা গেঁথে থাকে।
ভাষা-উপলব্ধি-স্বপ্ন-কল্পনা-সংবেদন এসব অনুভূত না হলেই ভাল হতো। চাবুকের শতাব্দীগুলো মানুষকে স্মরণ করতে হতো না। তলোয়ার বন্দুক চাবুক পরমাণুর শতক মানুষের মনে কি বীভৎসতা না তৈরি করেছে। ইংলান্ডের দুঃখী লেখক অস্কার ওয়াইল্ড তার 'দি পিকচার অফ ডোরিয়ান গ্র ' উপন্যাসে হেনরির মুখ দিয়ে তাই বলেছেন, 'আমেরিকা আবিষ্কার না হলেই ভালো হতো' হায়, আমেরিকা! একদিকে সেই 'পাউডার নদীর দেশ'(নতুন নাম আমেরিকা) উর্বর ভূমি দখল, তার জনসমষ্টি নিধন আরেক দিকে ভূমি চাষের জন্য দাস সংগ্রহ-বাণিজ্য। এ যাবৎকালে পৃথিবীতে যত নৈতিকতার মাপকাঠি তারা ঠিক করেছিল একের পর এক সে নৈতিকতা তারা নিজেরা ভঙ্গ করেছে। ইউরোপের নতুন অভিবাসীরা এমন নির্দয় হয়ে পড়েছিল, নতুন ভূমির মানুষের প্রতি একফোঁটাও দয়া দেখায়নি। প্রতিদিন তারা তাদের খুন করেছে, রক্ত ঝরিয়েছে। আদিবাসী রেডইন্ডিয়ান জনগোষ্ঠীর রক্তের উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, আফ্রিকান ভূমিপুত্রদের ঘাঢ়, হাঁটু, ভাঙা মেরুদণ্ড ও নির্যাতিত হৃদয়ের উপর দিয়ে এদের বিকাশ হয়েছে। মাত্র কয়েকটি শতাব্দী পৃথিবীকে তারা সম্পূর্ণভাবে বদলে দিয়েছে। প্রাচীন গ্রিসের কোন খ্রিষ্ট্রিয় মূল্যবোধ, প্রাচীন রোমের 'টুয়েলভ টেবল '(বার টেবল আইন) এসবের তারা কোন ধার ধারে নাই। বর্বর-লোভ তাদেরকে চালিত করেছে। (Bury My Heart at Wounded Knee- An Indian history of the American West-by Dee Brown) আমাকে কবর দিও হাঁটুভাঙার তীরে- আমেরিকার দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলীয় রেড ইন্ডিয়ানদের ইতিহাস, মূল ডি ব্রাউন, অনুবাদ-দাউদ হোসেন) 'উনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে উত্তর আমেরিকার প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলভাগে লুইস ও ক্লার্কের অনুসন্ধানী অভিযাত্রার পর থেকে মহাদেশটির সমগ্র পশ্চিম ভাগটির 'উন্মুক্তহওয়া' নিয়ে প্রকাশিত বই পুস্তকে, কাহিনী বিবরণের সংখ্যা ছাপিয়ে গেছে হাজার হাজারেরও কোটা। নথিভুক্ত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণমূলক প্রকাশনাগুলোর অধিকাংশই বেরিয়েছে ১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যবর্তী ওই ত্রিশ বছরের সময়কালের মধ্যে, সেটা 'আমাকে কবর দিও হাঁটুভাঙার তীরে' বইয়ের পটভূমি। ওই সময়টা ছিল ব্যক্তিস্বাধীনতা নামক আদর্শটির প্রতি প্রায় পূজনীয় এক দৃষ্টিভঙ্গি, তবে সেটাও ছিল আদতে ওই স্বাধীনতা যাদের ছিল তাদেরই'।
আলেক্স হেলির উপন্যাস শুধু আফ্রিকার দাস বাণিজ্য নিয়ে লেখা আফ্রিকার দাস হয়ে পড়া ভূমিপুত্রদের শিকড় সন্ধানের সাহিত্য নয়, এটি মানবজাতিকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে-নিপীড়নরে পর নিপীড়ন চালিয়ে, কারও জীবনে হঠাৎ স্বর্গপতনের মত ঘটনা ঘটলেও মানুষকে শেষ করে না দেওয়া পর্যন্ত সে তার স্বপ্ন, ইতিহাস, কল্পনা বয়ে বেড়ায়। এটি আশাহনীতায় জর্জরিত, ভেঙে চুরমার হওয়া সেই আশাবাদী মানুষের ইতিহাস। 'দি রোড'স হচ্ছে সেই মানবানুভূতির এপিক যা, ব্যক্তির বাঁচা-মরার মধ্য দিয়ে একটি বিপর্যস্ত, বিধ্বস্ত ব্যক্তি মনের ইতিহাসকে বয়ে বেড়ানোর জাতিগত আখ্যান।
হেলি, উপন্যাসের শেষে তাঁর- আফ্রিকান জাতিসত্তার শিকড়ের সন্ধান করেছেন কিভাবে তার বিষদ বিবরণ দিয়েছেন। একটি উপন্যাস লিখতে বিশটি বছর তিনি সময় নিয়েছেন। পাঁচটি মহাদেশের পঞ্চাশটি লাইব্রেরি, আর্কাইভস ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে তৎকালীন সমাজব্যবস্থা, সংস্কৃতি ও জীবনদর্শন নিয়ে গবেষণা করেছেন। জাহাজে করে তিনি অফ্রিকার গাম্বিয়ার সেই জুফরে গ্রামে গিয়েছেন। প্রায় দুশো-আড়াইশো বছরের সাতটি প্রজন্ম কিভাবে তাদের আত্মপরিচয় বুকের মধ্যে বয়ে বেড়িয়েছেন তার একটি দালিলিক আখ্যান মানবজাতির কাছে পেশ করেছেন। শিল্প সাহিত্য মানবজাতির জন্য কত বড় মূল্যবান ভাবসম্পদ, আলেক্স হেলি দি রোডস তার প্রমাণ।
শিল্পের কোন প্রথাগত সংজ্ঞা এ উপন্যাসের জন্য নয়। এখানে স্মৃতি, রক্ত, দীর্ঘশ্বাস, হারানোর হাহাকার, কাজ, ভাষার হিরে, চাবুক, তিরিস্কার, লাঞ্জনা, গ্লানি সব একাকার। আমরা অচিন দেশের কথা শুনেছি, লালন, ফ্রয়েড, লাঁকার সংজ্ঞা ও সজ্ঞায়। ভাষার হিরের দ্যুতি বাস্তবেই দেখেছি কুন্টা কিন্টের মনে। সে গোপন দেশ যে কত বড় আর কত সৌরভের মহিমায় সুন্দর, দুঃখে নিনাদিত শিকড়ের সন্ধানে উপন্যাস আমাদের তা দেখিয়েছে।
অমেরিকার নামধারী সাদা মানুষের হীনমন্যতা এখানে প্রকটিত হয়েছে। কেন হয়েছে তাও মানুষের জানা দরকার, যারা দাস ব্যবসার রক্ত বয়ে এনেছে, যারা লক্ষ লক্ষ মানুষকে দাস বানিয়েছে, সেই গ্রিক, রোমান সাম্রাজ্যের ভেতর দিয়ে তো ইউরোপিয় মানসের যাত্রা। 'গ্রিক ও রোমান সভ্যতার ভিত্তি ছিল ক্রীতদাস ব্যবস্থা- এটা এমন এক প্রথা ছিল যা ক্রমে সমাজ দেহে কর্কট রোগের মত ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ক্রীতদাস প্রথাকে কখনও সেভাবে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়নি। অ্যারিস্টটলের মতো দার্শনিক ও এর নিন্দা করেননি, সমাজের এক স্বাভাবিক নিয়ম হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। স্টোয়িকরা দাস ও স্বাধীন মানুষের সাম্যের কথা বললেও দাসপ্রথা অবসানের কথা বলেন নি। রোমান প্রিন্সপেট যুগের ইহুদি দার্শনিক আলেকজান্দ্রিয়ার ফিলো বলেন, সভ্যতা ক্রীতদাস ছাড়া বাঁচতে পারবে না। তাই নৈতিক আইন অনুয়ায়ী ক্রীতদাস ব্যবস্থাকে তিনি সমর্থন জানিয়ে ছিলেন।'
গ্রিস ও রোমান আরবীয়-ভারতীয় সভ্যতা দাসদের রক্ত ও গর্দান উপর দিয়ে তার কৃষ্টি-কালচার দাঁড় করিয়েছিলেন। লক্ষ লক্ষ ভূখা-নাঙা ক্রীতদাস নিয়ে এ সভ্যতাগুলো পরিব্যাপ্ত হয়েছিল। আমেরিকা ইউরোপিয়ান এক্সটেনশন, আমেরিকা তাদেরই জাতভাই। যারা স্বর্ণ রৌপ্য জ্যাসপার লোভী ডাকাত, দস্যু, তস্কর, যারা অভাবী, নাঙাভুখা তারা এসে আমেরিকার নামের আদিবাসীদের এ ভূখণ্ড দখল করে। তারা স্থানীয় জনগোষ্ঠী মেষ পালকদের হত্যা করে, এসব আমাদের জানা। গরীব ইউরোপিয়ানরা জুয়া, কৃষি খামার, মোরগ লড়াই ইত্যাদির মাধ্যমে দ্রুত ধনী আমিরকান হয়ে ওঠে। 'রেভারেন্ড জন নিউটন, এক দাসবাহী জাহাজের ক্যাপ্টেন ছিলেন, পরবর্তীসময়ে অপরাধের গ্লানি চেপে ধরে তাকে। তিনি জানাচ্ছেন, 'হতভাগ্য প্রাণীগুলো এক অপরের সাথে এমনভাবে লোহার শিকলে বাঁধা অবস্থায় পড়ে থাকত যে নড়ার উপায় ছিল না। পাশ ফিরাও সম্ভব ছিল না, আঘাত না পেয়ে বা পাশের জনকে আঘাত না দিয়ে। প্রতি সকালেই দেখা যেত, একজন জীবিতের সাথে একজন মৃত একত্রে বাঁধা অবস্থায় মৃত পড়ে আছে।' কি মর্মান্তিক দৃশ্য, কি অমানবিক। যারা এই দাসব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল তারা মানবিক ধর্মীয় সামাজিক আদি টোটেমীয় কোন রীতিনীতিকে মর্যাদা দেয় নাই, সমস্ত নীতিকে রক্তাক্ত করেছে, পায়ে পিষেছে। সভ্যতার সব সৌন্দর্য তারা তলোয়ার, বন্দুক, কার্তুজ, চাবুকে, ঘৃণায়, হিংস্রতায় রক্তাক্ত করেছে। তাহলে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসে, যে 'সভ্যতা জিনিশটা কি, কি ভাবেই তাকে সংজ্ঞায়িত করা যায়'। খ্রিষ্টিয় সভ্যতা বলে যদি কিছু তৈরি হয়ে থাকে, রেনেসাঁ, এনলাইটেটমেন্ট, ফরাসি বিপ্লবসহ রক্তদান ও জ্ঞান সাধনার বিজ্ঞান নিয়ে মানুষ কি করবে?
আফ্রিকার গাম্বিয়ার জুফরি গ্রাম- নদনদী, নারী, খালবিল, নাশী, প্রকৃতি, পাহাড়, আদি বৃক্ষ, আদি রীতিনীতি নিয়ে সুখের একটি জগত। মুসলিম তারা আরবের ধর্মের সঙ্গে নিজেদের প্রাকৃতিক ধর্মের জীবন একাত্ম করে নিয়েছিল এই আফ্রিকান জনগোষ্ঠী। জীবনধারণের জন্য নেই কোন আকুলতা। পাহাড় তাদেরকে খাদ্য জোগায়, নদী তাদের দেয় মিষ্টি জল, বাতাস দেয় মৌসুমী হাওয়া। পাখি হাঁস পতঙ্গ জীবজন্তু সব আছে তাদের। কোন অভাব নেই, কোন হাহুতাশ নেই। শুধু গাম্বিয়া নয় আফ্রিকার এমন সাজানোগোছানো প্রাকৃতিক ভূখণ্ড থেকে মানুষ ধরে এনে বিক্রি করেছে সাদা দাস ব্যবসায়ীরা। আমরা যদি সেমবেন উসমানের 'উপজাতির ক্ষতচিহ্ন'(ভোলতেইকরা-অনুবাদ মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, আফ্রিকান সাহিত্য-২, পৃষ্ঠা : ৩০৩) গল্পটি দেখি, সেখানেও দাস ব্যবসার মর্মান্তিক চিত্র ফুটে উঠেছে। এক কথায় আমেরিকা আবিষ্কার হওয়ার আগে দাস ব্যবসারও যে একটি নৈতিকতা ছিল তাও আর রইল না, মানুষ-ডাকাতিই তারা শুরু করে দিল। আফ্রিকার অপরাধাহীন প্রকৃতির সন্তানদের উপর দাগী অপরাধীর চেয়েও অমানুষিক যন্ত্রণার যত ধরনের উপায় আছে সব তারা ব্যবহার করেছে। সেটা দাস ধরে নিয়ে আসার সময়, সাগরের জাহাজের মধ্যে, যখন তারা বিক্রি হয়ে আমেরিকায় মালিকের কাছে আসতে পারলো, তখন তাদের জীবনে ঘটে আরও গ্লানি, নিষ্পেষণ, যন্ত্রণা, বেদনা, ঘৃণা, তৈরি হয় গোপন একটি জগত। 'পাউডার নদীর দেশ' আমিরিকার আগের নাম মায়া আদিবাসীদের দেওয়া। (Bury My Heart at Wounded Knee- An Indian history of the American West- by Dee Brownআমাকে কবর দিও হাঁটুভাঙার তীরে- আমেরিকার দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলীয় রেড ইন্ডিয়ানদের ইতিহাস, মূল ডি ব্রাউন, অনুবাদ-দাউদ হোসেন)। এই ভূমিপত্রদের তারা ডাকতে লাগলো রেডইন্ডিয়ান নামে, তাদের গোত্র পরিচয়, জাতি পরচিয় বেমালুম মুছে দিল তারা, অমানুষিক কায়দায় তাদের হত্যা করলো। এই রেডইন্ডিয়ানদেরও কেউ কেউ দাস হয়ে পড়েছিল। এদর মধ্যে অনেকে যুদ্ধ করতে করতে মরে পড়েছে, কেউ কেউ সাদাদের হাতে বন্দি হয়েছে, কেউ কেউ পালিয়েছে পাশের দেশসমূহে। আর যারা অর্ধমৃত অবস্থায় মরে পড়েছিল তাদেরকে এখন আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ান টেরিটোরি করে বন্দি করে রেখে দিয়েছে। এদের সঙ্গে আফ্রিকানদের মধ্যে উভয়ই নির্যাতিত বলে সূদুর আফ্রিকান ও পাউডার নদীর দেশের অনাত্মীয় অপরিচিত হলেও একই ধরনের বিপদের মধ্যে পতিত বলে এদের মধ্যে মায়া ও আত্মীয়ভাব জমে আর সেখান থেকে তৈরি হয় সম্পর্কও। 'শেকড়ের সন্ধানে বা দি রোডস' উপন্যাসে আলেক্স হেলি বুকের জখমের এই রক্তাক্ত দাগসহ আফ্রিকান ও রেডইন্ডিয়ান আদিবাসীদের মনোজগতের দাগ উন্মোচন করেছেন। মানবজাতির যে কোন পাঠককে এটি সংবেদনশীল করে তুলবে। এটি এমন এক উপন্যাস যাতে ভর করেছে পৃথিবীর সমস্ত বেদনা, সমস্ত যাতনা, আর মানব নিগ্রহের বিষাক্ত চাবুক। এই উপন্যাস টিভি সিরিয়াল হয়েছে, যারা সিরিয়ালটি দেখেছেন তারা জানেন এই এপিকের মূল্য কি। মানবজাতির ইতিহাসের ভাবসম্পদ হিসেবে এই উপন্যাস বা সিনেমা কতটা প্রয়োজন ছিল, ঠিক সেই প্রয়োজনীয় কাজটি করেছেন আলেক্স হেলি। মহাকাব্যিক এপিক, মহাকাব্য, ঐতিহাসিক গ্রন্থ, ইতিহাসের অগ্রযাত্রা, ইতিহাসের মাইলফলক, গল্প, নাটক, গাথা, কি বিষেশণে বিভূষিত করা যায় এই উপন্যাসকে।
যারা এই উপন্যাস পড়েছেন তারা নিশ্চয় কুন্টা কিন্টেকে কেউ ভুলতে পারেননি। কেননা, কুন্টা কিন্টে মানব জীবনের এমন এক বেদনাদায়ক পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলেন, সে বেদনার ভার সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। সে দস্যু দ্বারা আক্রান্ত হয়, মানব বেদনায় কুকড়ে যায় কল্পনার চেয়ে নিষ্ঠুর বাস্তবতায়। কালো মানুষের উপর সাদা মানুষের নিপীড়ন মানুষ এই উপন্যাসের মাধ্যমে বিশেষভাবে জানতে পারে। দাসপ্রথা উৎপত্তি হয়েছিল কোথায় ইতিহাসের ছাত্রমাত্রই জানে। প্রাচীন গ্রিসের সমাজ ব্যবস্থা দাসত্বের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল, পরবর্তীকালে সেটি বিস্তার হয়েছিল প্রাচীন সব সভ্যতায়। পৃথিবীর প্রথম মহাকাব্য গিলগামেশ, প্রাচীন গ্রিসের মহাকবি হোমার রচিত ইলিয়াড, ওডিসি, প্রাচীন ভারতের মহামুনি বাল্মিকী যে কাব্য রচনা করেছিলেন সেখানেও দাসত্বের সন্ধান পাওয়া যায়। এভাবে দাসত্ব ছড়িয়ে পড়ে শতাব্দী থেকে শতাব্দী। রোম সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দাসদের রক্ত, মেরুদণ্ড, হৃৎপিণ্ডের উপর। প্রাচীন যুগ পার হয়ে মধ্যযুগে ধর্ম এসে চেষ্টা করেছিল দাসপ্রথা বিলুপ্ত করতে কিন্তু পারেনি। মানবকল্যাণের সমস্ত দেনা শোধ করেও ঐ সময় দাসপ্রথ বিলুপ্ত করা যায় নাই।
এই অমানবিক দাসপ্রথা কত পরিবার, গোষ্ঠী, সমাজকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। জন্মভূমি, সমাজ, প্রকৃতি হারানোর বেদনা আর কোনদিন পূরণ করতে পারেনি বন্দি মানুষগুলো। আপনজনের সঙ্গে দেখা করার যে দুর্দমনীয় অভিপ্রায় তা তো পূরণ হয় নাই, সে যাতনা বুকে নিয়ে সইতে হয়েছে গ্লানী, বিষাক্ত চাবুক, হিংস্রতা। অপরদিকে সইতে হয়েছে মুখরা মানুষের কথার চাবুকও। কুন্টা কিন্টে একটি সভ্য, আধাসভ্য সমাজের মানুষ হিসেবে বন্দি হয়েছিল বলে তবুও মনে রেখে দিয়েছিল তার বেড়ে ওঠার প্রকৃতি, জনপদ, জন্মভূমি। কিন্তু লক্ষ লক্ষ দাস আর কোনোদিন এক প্রজন্ম ছাড়া তাদের পূর্বপুরুষের জনপদ, সমাজ এমনকি আর কখনও দেশেও ফিরতে পারেনি। ফিরবেই বা কি করে। দাসদের নাম পর্যন্ত বদলে দেওয়া হয়েছে। তেমনি করে কুন্টা কিন্টের নাম বদলে হয়ে গিয়েছে 'টবি'। কিন্তু কুন্টা কিন্টের অনমনীয় মনোবল, স্মৃতিশক্তি, কান্না, বুকের জখম তাকে তার দেশ ভুলতে দেয় নাই। তাই কুন্টা কিন্টে তার মেয়েকে তার দেশের নদী, ভূখণ্ড, পশু পাখি ইত্যাদি বিষয় মুখে মুখে শিখিয়ে দেয়, স্মরণ করিয়ে দেয় তার ফেলে আসা জীবনের কথা। এই অনমীয় গোপন বেদনার দৃঢ়তার কারণে আমরা একটি মহাদেশের ইতিহাস, একটি নিপীড়িত দেশের নিষ্ঠুর মানুষের ইতিহাস, প্রায় তিনশো শতাব্দীকে আয়নায় স্পষ্টভাবে দেখতে পাই।
এই বেদনা এই গ্লানি বুকে নিয়ে আমরা বলতে পারি 'শিকড়ের সন্ধানে; উপন্যাসটি না হলে দাসত্বের এই কলঙ্ক আমার কেউ বুঝতাম না। রূপপকথার গল্পের মত সাদাদের ইতিহাসই আমরা মুখস্থ করতাম। আলেক্স হেলি ইতিহাসের এমন এক সন্তান যিনি সভ্যতার সমস্ত দায় বুকে নিয়ে ইতিহাসকে মুক্তি দিয়েছেন সভ্যতার মানিবক সৌন্দর্যে। ইতিহাসকে তিনি পৌঁছে দিয়েছেন মানুষেনর হৃৎপিণ্ডে, শিরায় শিরায়। মানুষ নিঃশ্বাস ফেলতে পেরেছে, মুক্ত আকাশ দেখতে পেরেছে, নদীর ঢেউ আর আকাশের তারা গুনতে পেরেছে। মানুষ নিজের মত করে ভাবতে পেরেছে, নাচতে পেরেছে, তার প্রিয়তমাকে নিয়ে নদীর ধারে, ঝোঁপঝাড়ে বেদনাকে পরিব্যাপ্ত করতে পেরেছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এ এক বিরাট উলম্ফন। মানুষ আফ্রিকা মহাদেশের ঐশ্বর্যের প্রতি চোখ ফেরাতে বাধ্য হয়েছে। আলেক্স হেলি শতাব্দী সেই বেদনার সন্তান যিনি কয়েকটি শতাব্দীর বেদনা একাই বহন করেছে।
মানুষ যদি নিজের মানবিক দায়িত্বের প্রতি দায়বদ্ধ হয়, নিজের জাতির প্রতি ঐতিহাসিক দায়িত্বটি বুঝে নিজে নিজেই পা ফেলে সমাধানে, তাহলে মানুষের দায়িত্ব পালন হয়ে যায়। একজন আলেক্স হেলি কি বেদনার অভিজ্ঞতা নিয়ে শিকড়ের সন্ধানে উপন্যাসটি রচনা করেছেন। তিনটি মহাদেশের পঞ্চাশটি লাইব্রেরি তিনি তন্ন তন্ন করে ঘেটেছেন, তার জবানিতে আমার বিষয়টি দেখি, ''বাবার কাছে শুনেছি আমার মাতামহের পুত্রের আকাক্সক্ষা আমাকে পেয়ে পূর্ণ হয়েছিলো, সপ্তাহে খানেক পরে আমাকে ও মাকে হেনিঙে রেখে বাবা ইথাকা ফিরে গিয়েছিলেন তার স্নাতকোত্তর ডিগ্রী পড়া শেষ করার দরকার ছিল। দাদা মশায় ও দিদিমা বিশেষ করে দাদামশায় আমাকে পুত্রাধিক স্নেহ করেছিলেন। দিদিমার কাছে শুনেছি আমি হাঁটতে শেখার আগেই দাদা মশায় কোলে করে নিয়ে আমাকে তার পাশে রেখে কাঠের ব্যবসার অফিসে কর্ম সারতেন। হাঁটতে শিখবার পর তিনি আমাকে নিয়ে শহুরে বেরোতেন। আমার তিন পদক্ষেপে তার এক পদক্ষেপ হতো। ক্ষুদ্র মুষ্টিতে তার বাঁ হতের তর্জনীটি ধরে থাকতাম। পরিচিত জনের সঙ্গে দেখ হলে তিনি কথা বলতেন। লোকের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বিনীত, স্পষ্ট স্বরে কথা বলতে তিনি আমাকে শিখিয়েছিলেন। লোকে বলতো, বাঃ কি সুশিক্ষা! দাদা মশায় বলতেন হ্যাঁ ঠিক পথেই যাচ্ছে।'
'আমার পাঁচ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়, আমাকে কেউ শান্তনা দিয়ে শান্ত করতে পারছিল নাÑ এত অস্থির হয়েছিলাম যে ডাক্তার আমাকে ঘুম পাড়াবার ঔষধ দিয়েছিলেন। মনে আছে বাড়ির সামনে সাদা ও কালো মানুষের বিরাট লাইন হয়েছিলো। সবাই নত মস্তকে শোকাহত, স্তব্ধ দাঁড়িয়েছিল। পরের কয়দিন আমার স্মৃতিতে শুধুই কান্না। যেনÑ পৃথিবী শুদ্ধ মানুষ নিরালম্বন কান্নার সুরে ভাসছিলো।'
শোক ভুলে থাকবার জন্য দিদিমা তার আত্মীয়দের প্রায় তাঁর কাছে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানাতেন। তাঁদের বয়স তাঁর মতই পঁয়তাল্লিশ থেকে বা পঞ্চান্ন। তারা দিদিমার বোন, ভাতৃবধূ, ভাইঝি, বোনঝি ইত্যাদি। তারা একত্রে হলে তাদের বাল্যকালের গল্প বলতেন। আমাকে দেখিয়ে বলতেনÑ 'তখন আমার ঐ বয়স'। সেই কুঞ্চিতচর্ম পৌড়রা কখনো আমার বয়সী ছিল কল্পনা করতে পারতাম না। যাই হোক তাদের কথাবার্তা শুনে মনে হতোÑ তারা আমার অপিরিচিত দিনের কোন কাহিনী শুনাচ্ছে। 'মালিক' 'মালিকানী' 'আবাদ' এই শব্দগুলো কতগুলো অদেখা মানুষের নামে শুনতে প্রায়ই পেতাম। তাঁদের মাঝে সবচেয়ে গোড়ার দিকের মানুষটিকে তারা আফ্রিকার লোক বলে উল্লেখ করতেন। সেই মানুষটিকে তাদের উচ্চারণে 'নাপোলিস' নামে একটা জায়গায় জাহাজে করে এখানে আনা হয়েছিল। ভার্জিনিয়া জেলার স্পটসিলভিনিয়া রাজ্যের জনওয়ালার সাহেব তাকে কিনে নিয়েছিল। সেই অফ্রিকার লোকটি প্রথম দিকে বারবার পালাতে চেষ্টা করেছিল। চতুর্থবার পালাবার পর সে অপরাধে তাকে এমন শাস্তি দেওয়া হয়েছিল যা দেখে অন্যন্য বন্দীদেরও সমুচিত শিক্ষা হয়। তাঁর একটি পায়ের পাতার অর্ধেক কেটে ফেলা হয়। শ্বেতকায়রা এমন হীন, অমানবিক কাজ, কি করে করতে পেরেছিলোÑ আমার শিশুমনে বুঝে উঠতে পারতাম না। সেই প্রৌড়দের মুখ থেকে জানতে পেরেছিলাম জন ওয়ালারের ভাই ডা. উইলিয়াম ওয়ালার এই অকারণ নৃশংস অঙ্গেচ্ছেদে অত্যন্ত বিরক্ত হয়েছিলেন। তিনি ক্রীতদাসটি ক্রয় বরে নিজের আবাদে নিয়ে এসেছিলেন। চিকিৎসা করে মরাণাপন্ন লোকটিকে তিনি সুস্থ্য করে তোলেন। পঙ্গু হয়ে গেলেও ক্রীতদাসটি কিছু কিছু কাজ করতে পারত। ডাক্তার প্রথমে তাকে বাগানের কাজে লাগিয়েছিনে। অফ্রিকা থেকে নিয়ে আসা এই বিশেষ ক্রীতদাসটি তার পঙ্গুত্বের জন্য একই আবাদের দীর্ঘদিন ধরে থেকে গিয়েছিল। নইলে তখন ক্রীতদাসদের এমন ঘন ঘন বিক্রি করে দেওয়া হত যে তাদের সন্তানদের পক্ষে নিজের মা বাবাকে চেনা বা তাদের সাথে সম্পর্ক রাখা সম্ভব ছিল না। আফ্রিকা থেকে নিয়ে আসা ক্রীতদাসেদের তাদের মালিক ইচ্ছামত নামকরণ করতেন। এই বিশেষ ক্রীতদাসটির নাম দেওয়া হয়েছিল 'টবি'। অন্যান্য ক্রীতদাসেরা তাকে টবি নামে ডাকলে সে রুষ্ট হয়ে আপত্তি জানাতো এবং বলতো তার নাম কুন্টা কিন্টে। কিছুদিন বাগানে কাজ করার পর তাকে মালিকের গাড়ির চালক করা হয়েছিল। এই টবি বা কুন্টা কিন্টের সঙ্গে 'বড় বাড়ির রাঁধুনী' বেল নামে ক্রীতদাসীর বিবাহ হয়। তাদের একটি মেয়ে জন্মায় তার নাম রাখা হয়েছিল 'কিসি'। মেয়েটির যখন পাঁচ বছর বয়স তার আফ্রিকা দেশিয় বাবা সুযোগ পেলেই হাত ধরে তাকে বেড়াতে নিয়ে যেতো, বিভিন্ন জিনিস দেখিয়ে আফ্রিকা দেশের ভাষায় প্রতিশব্দ শেখাতো। যেমন গিটার দেখিয়ে বলতো এটাকে 'কো' বলে। আবাদের কাছে ম্যাটিপিনি নদী ছিল সেটি দেখিয়ে বলতেন 'কাম্বি কালিঙ্গো' কিসি একটু বড় হয়ে উঠতেই ততদিনে তার আফ্রিকা দেশিয় বাবা অনেকটা ইংরেজি ভাষায় দক্ষ হয়ে উঠেছিল। তখন সে কিসিকে তার নিজের সম্পর্কে তার স্বদেশবাসী সম্পর্কে গল্প বলতো। বলেছিলোÑ সতের বছর বয়সে গ্রামের কাছে একটি জঙ্গলে সে যখন ডাক বানাবার জন্য কাঠ কাটতে গিয়েছিল, তখন চারজন সাদা মানুষ তাকে জোর করে ধরে এনে ক্রীতদাসে পরিণত করেছে।
'বৃদ্ধ চারণ কিন্টে বংশের যশোগাথা শুরু করলো। একবারে বংশের প্রথম পুরুষ থেকে শুরু করে প্রতিটি ব্যক্তির অতি বিশদ বিবরণ। কৈরাবা কুন্টে কিন্টের তিনপুত্র ছিল। কণিষ্ঠ পুত্র অমোরোর ত্রিশ বৎসর বয়সে বিন্টা কেব্বা নামে একমানডিকা বংশীয় কন্যার সাথে তার বিবাহ হয়। আনুমানিক ১৭৫০ থেকে ১৭৬০ খ্রিষ্টাব্দের মাঝে তাদের কুন্টা, ল্যামিন, সুওয়াডু ও ম্যাডি নামে চারটি পুত্র জন্মায়। এদের মাঝে জ্যেষ্ঠ কুন্টা একদিন গ্রামের বাইরে জঙ্গলে কাঠ কাটতে গিয়েছিলো। তাকে আর কখনো দেখা যায়নি।
আমি প্রস্তুরিভূত হয়ে গেলাম। এ লোকটি সারাজীবন এই সুদূর অনুন্নত দেশে কাটিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার লেশ মাত্র সম্পর্ক নেই। টেনেসি রাজ্যের হেনিঙে দিদিমার বাড়ির বারান্দায় বাল্যকালে আমি যে কাহিনি শতবার শুনেছি, এর পক্ষে তা জানবার কোন সম্ভাবনাই ছিল না। অথচ যথার্থই বহু দূরে ভার্জিনিয়া দেশে এক আফ্রিকাবাসী দৃঢ়তার সাথে বারবার সকলকে জানিয়েছিল তার প্রকৃত নাম কিন্টে। সে গিটারের নাম 'কো' বলেছিল। ভার্জিনিয়া দেশের একটি নদীকে সে 'কাম্বি বলোঙো নামে অভিহিত করেছিল। সে জানিয়েছিলো- একটি ঢাক বানাবার জন্য কাঠ সংগ্রহ করতে জঙ্গলে গিয়ে সে অপহৃত হয় এবং অবশেসে ক্রীতদাসে পরিণত হয়। কোনক্রমে ব্যাগ থেকে বার করে আমি দোভাষিকে দেখালাম। সেখানে দিদিমার বলা কুন্টা কিন্টের কাহিনি লেখা ছিল। সে পড়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলো। চারণকে নোটবই দেখিয়ে বুঝিয়ে বলতে সে অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল। উপস্থিত জনতাকে ব্যাপারটা জানাতে তারা সকলেই নিদারুণ উত্তেজিত হয়ে উঠলো।
কেউ তাদেরকে কোন নির্দেশ দেয়নি। কিন্তু আমার চারিপাশে যারা ঘিরে ছিলো তারা নিজেরাই একটা বৃত্ত রচনা করে ফেললো। তারপর সুসংবদ্ধভাবে নাচতে নাচতে গান শুরু করলো। দশ বারটি মেয়ের পিঠে কাপড়ের ফালিতে ক্ষুদ্র শিশু বাঁধা ছিল। তাদের একজন এগিয়ে এসে তার শিশুটিকে আমার কোলে তুলে দিলো। মেয়েটি ঘোর কৃষ্ণবর্ণ মুখখানি গভীর আবেগে উদ্দীপ্ত। আমার কোলে তুলে দিয়ে আবার সে শিশুটিকে ছিনিয়ে নিলো। এমনি করে প্রতিটি শিশুর মা-ই তাদের কোলের শিশুকে আমার কোলে তুলে দিয়ে আবার ফিরিয়ে নিলো। এমনি করে প্রতিটি শিশুর মা-ই তাদের কোলের শিশু আমার কোলে তুলে দিয়ে আবার ফিরিয়ে নিচ্ছিলো।
প্রায় এক বৎসর পরে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ড. জেরোম ব্রুনারের কাছে জেনেছিলাম এটি মানবজাতির একটি অতি প্রাচীন উৎসব। তারা এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বলতে চেয়েছিলো- এই রক্ত মাংস আমাদের। এ তোমার হলো। তুমি আমাদের হলে।
ফিরবার পথে পর্দায় প্রতিফলিত ছায়াচিত্রের মতো আমার মানসচক্ষে একটার পর একটা ছবি ভেসে উঠেছিলো। সবই আমার পূর্বশ্রুত কাহিনির প্রতিফলন। আমার লক্ষ লক্ষ পূর্বপুরুষকে এরা কুন্টা কিন্টের মতো একজন একজন করে বাহুবলে পরাজিত করে বন্দি করেছিলো। আবার কোথাও অপহরণকারীর দল গ্রামসুদ্ধ জ¦ালিয়ে দিয়েছে। সুদূর বিদেশে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করবার জন্য হতভাগ্য বন্দিদের গলায় গলায় বেঁধে দীর্ঘ সারিবদ্ধ লাইনে সমুদ্রতীর পর্যন্ত হাঁটিয়ে নিয়ে গিয়েছে। অমানুষিক অত্যাচারে শতশত লোক পথেই প্রাণ হারিয়েছে। যারা সমুদ্রতীরে পৌঁছোতে পেরেছিলো, তাদের সর্বাঙ্গে চর্বি মাখিয়ে, চুল কামিয়ে নির্লজ্জ অবহেলা ভরে প্রতিটি অঙ্গ তন্ন তন্ন করে পরীক্ষা করা হয়েছে জ¦লন্ত লোহা দিয়ে গায়ে চিহ্ন এঁকে দিয়েছে। শৃঙ্খলাবদ্ধ বন্দিদের প্রচণ্ড কশাঘাত, জাহাজে তুলবার প্রাণান্তকর চেষ্টায় নিষ্ঠুরভাবে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া- সবই যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিলাম। আমার পূর্বপুরুষেরা স্বদেশ আঁকড়ে থাকবার প্রাণপণ চেষ্টায় শিকলে বাঁধা অক্ষমদেহে সমুদ্রতীরের বালি মুখ কামড়ে ধরেছিলো। নির্মমভাবে মারতে মারতে জোর করে তাদের জাহাজের দুর্গন্ধ খোলের ভিতর গদাগদি করে ঠেসে দেওয়া হয়েছিল। তাদের নড়বার এমন কি পাশ ফিরবার জায়গা পর্যন্ত ছিল না। প্রতিটি বন্দি একের সাথে অপরে হাতে হাতে শিকল দিয়ে বাঁধা। ততক্ষণে আমার পরিচয় চারদিকে প্রচারিত হয়ে গেছে। পথের দু'পাশে যুবক, শিশু, বৃদ্ধ, নারী পুরুষ ভীড় করে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে 'মিষ্টার কিন্টে' বলে চিৎকার করছিলো। আমি পরিণতবয়স্ক পুরুষ। বলতে দ্বিধা নেই সেদিন দুই হাতে মুখ ঢেকে আমি শিশুর মত অবাধে উচ্চৈঃস্বরে কেঁদেছিলাম। আমার স্বদেশবাসীর প্রতি সেই অবিশ্বাস্য, অমানবিক অত্যাচারের ইতিহাস সমগ্র মানবজাতির কলঙ্ক বলে বোধ হয়েছিল।
আফ্রিকা থেকে ফিরে যাবার পথে সংকল্প করেছিলাম-একটি বই লিখবো। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি কৃষ্ণবর্ণ মানুষের পেছনে নিশ্চয় কুন্টার মতো একজন পূর্বপুরুষের অস্তিত্ব আছে, একজন আফ্রিকাবাসী- যাকে বন্দি করে, শৃঙ্খলাবদ্ধ অবস্থায় জাহাজে সমুদ্র পার করে নিয়ে এসে ক্রীতদাসে পরিণত করা হয়েছে। পরে ভার্জিনিয়া রিচমণ্ডে সরকারি নথিপত্রে ১৭৮৬ খ্রিষ্টাব্দের ৫ সেপ্টেম্বরের তারিখে একটি আইনসিদ্ধ দলিল খুঁজে পাই। জন ওয়ালার ও তাঁর স্ত্রী অ্যান ওয়ালার উইলিয়াম ওয়ালারকে কিছু স্থাবর সম্পত্তির সাথে ‘টবি’ নামে একজন নিগ্রো ক্রীতদাসকে হস্তান্তর করেছিলেন।
শিকড়ের সন্ধানে কাহিনি লিখবার আগে আবার আফ্রিকাতে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে জাহাজে করে যুক্তরাষ্ট্র ফিরি। আফ্রিকা থেকে সোজা যুক্তরাষ্ট্র আসে এমন কোন মালবাহী জাহাজের সন্ধান করেছিলাম। কুন্টা কিন্টেদের ক্রীতদাসবাহী জাহাজের যে পথ পার হতে প্রায় একশো দিন লেগেছিলো, আধুনিক মালবাহী জাহাজ সেপথ মাত্র দশদিনে অতিক্রম করেছে। প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা আহারের পর বেশ কটি লোহার মই একটার পর একটা অতিক্রম করে জাহাজের অতি গভীর, ঠাণ্ডা, অন্ধকার খোলের ভিতর নেমেছি। উর্ধ্বাঙ্গ নগ্ন করে সেখানকার কর্কশ, নিরাবরণ কাঠের উপর শুয়ে থেকেছি। কুন্টা কিন্টের শারীরিক ও মানসিক মরণাধিক যন্ত্রণা কল্পনায় অনুভব করতে চেষ্টা করেছি। অবশ্য আমার বিলাসবহুল সমুদ্রযাত্রার সঙ্গে কুন্টা কিন্টে ও তার সঙ্গীদের অতি ভয়ঙ্কর অগ্নিপরীক্ষার কোন তুলনা হয় না।
অনেকে প্রশ্ন করবেন 'শিকড়ের সন্ধানে' কতটা সত্য ঘটনা আর কতটা কল্পনা। আমি সাধ্যমত আমার আফ্রিকাবাসী ও আমেরিকারবাসী আত্মীয়দের মুখে মুখে রক্ষিত কাহিনীর প্রতি অনুগত থেকেছি, সরকারি দলিলপত্রে প্রাপ্ত প্রমাণিক তথ্য অনুসরণ করেছি। রসেটা স্টোন দেখার পর বারো বৎসর ধরে এই অনুসন্ধান চালিয়েছি। এ কাজে অন্ততঃ পাঁচলক্ষ মাইল পরিভ্রমণ করেছি। অসংখ্য লোকের সাথে এ প্রসঙ্গে আলোচনা করেছি। তিনিটি মহাদেশের অন্ততঃ পঞ্চাশটি লাইব্রেরি, আরকাইভস ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে তৎকালীণ সমাজব্যবস্থা, সংস্কৃতি ও জীবনদর্শন নিয়ে গবেষণা করেছি। কাহিনির ঘটনাকালে আমি উপস্থিত ছিলাম না। কাজেই কথাবার্তা, দৈনিন্দিন ইতিবৃত্তে কিছুটা নাটকীয়তার আশ্রয় নিতে হয়েছে। কিন্তু পারিপার্শ্বিক অবস্থায় যেমন ঘটা সম্ভব বলে নিজের মনে অনুভব করেছি, প্রকৃত তথ্যের সাথে ততটুকুমাত্র সংযোজিত হয়েছে। আমার বিশ্বাস দিদিমা ও তাঁর সমসাময়িক অন্যান্য বৃদ্ধারা ওপর থেকে গভীর আগ্রহে আমার পরিশ্রম ও গবেষণার উপর লক্ষ্য রেখেছেন। শুধু তাই নয়, তাঁরা অবশ্যই আমাকে সঠিক পথনির্দেশও করেছেন। এ ছাড়া কুন্টা ও বেল, কিসি, চিকেন জর্জ ও ম্যাটিলডা, টম ও আইরিন, আমার দাদামশায় উইল পমার এবং আমার মা বার্থা এঁরাও নিশ্চয় সকৌতূহলে এই রচনা দিকে তাকিয়ে আছেন। সবার শেষে তাঁদের সাথে যোগ দিয়েছেন আমার বাবা। তাঁর তিরাশি বৎসর বয়স হয়েছিল। আমার দৃঢ় বিশ্বাস তাঁরা উপর থেকে যেমন আমার এ প্রচেষ্টার ওপর লক্ষ্য রেখেছেন, তেমনি আমাদের পূর্বপুরুষ সম্পর্কে এ ইতিহাস লিপিবদ্ধ করবার সার্থকতাও অনুভব করেছেন"।
প্রাচীন পৃথিবীর সব বর্বতা পার হয়ে মধ্যযুগের ধর্মীয় সভ্যতার আলোড়নে খ্রিষ্টিয় আলোকায়নের যুগে কেন দাসপ্রথা বা দাসব্যবসা আবার নতুন করে শুরু হল। কারা করল? সেই ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখবো-'কলোনিয়াল দাসপ্রথা শুরু করেছিল পর্তুগিজ জলদস্যুরা, আফ্রিকা থেকে কালোদের ধরে নিয়ে তারা ইউরোপে বিক্রি করত, পর্তুগিজদের দেখাদেখি সহজ আয়ের সুযোগ হিসেবে অন্যান্য ইউরোপিয়রাও দাস ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। হাজার হাজার ক্রীতদাস নিয়ে দাসব্যবসায়ীর জাহাজগুলো ভূমধ্যসাগর-আটলান্টিক সাগর পার হয়ে আে মরিকা পাড়ি দিত। কিন্তু তীরে পৌঁছতে পৌঁছতে তা কয়েক শতে নেমে যেত। যে সব হতভাগা জাহাজে মারা পড়ত তাদেরকে ফেলে দেওয়া হত সাগরেই, তিমি, হাঙ্গরসহ অন্যসব মাছের খাবার হিসেবে। জাহাজে দাসদের অমানবিক নির্যাতন আমরা শিকড়ের সন্ধানে উপন্যাসে পড়েছি আর টিভি সিরিয়ালে দেখেছি এসব হতভাগা মানুষদের প্রতি কি মর্মান্তিক নির্যাতন করেছেÑ দাসব্যবসায়ীরা। দাসব্যবসায়ীদের এমন নিষ্ঠুর নির্যাতনের পরে মানববিবেকসম্পন্ন মানুষ-যাদের দাস বানানো হয়েছে তারা কিন্তু মুখ বুজে তা সহ্য করেনি, মিশর, সিরিয়া, বাইজেন্টাইন, রোম, গ্রিস, ভারতবর্ষ, চিন, জাপানসহ সব দেশে দাসেরা বিদ্রোহ করেছে, ফিরে পেতে চেয়েছি তাদের মানবিক জীবন, মৌলিক অধিকার।
এ রকম একজন গ্লাডিয়েটর'স বা ক্রীতদাস ছিলেন স্পার্টাকাস খ্রিষ্টপূর্ব ৭৩ অব্দে। পুরো রোম সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। ফরাসি বিপ্লবের নায়ক দার্শনিক ভলতেয়ারের জীবনের নায়ক হয়ে উঠেছিলেন স্পার্টাকাস। ভলতেয়ার বলেছেন, 'স্পার্টাকাসের যুদ্ধ সবচেয়ে ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধ, হয়তো একমাত্র ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধ'। ভলতেয়ার, ভাবা যায়! পৃথিবীজুড়ে প্রভাবশালী ব্যক্তির জীবনের নায়ক একজন ক্রীতদাস। মানুষের কর্মই মানুষকে মহৎ করে অন্যকিছু নয়। স্পার্টাকাস একজন ক্রীতদাস থেকে একজন বিদ্রোহী, আর মানবসভ্যতার মানবিক পরিবর্তনের একজন বীর ও শহিদ। আধুনিক কালের সবচেয়ে প্রভাবশালী বিপ্লবী ও দার্শনিক কার্ল মার্কসও স্পার্টাকাসকে তার জীবনের নায়ক মনে করতেন। ইতিহাসে তার প্রিয় চরত্রি কে? কন্যার এই প্রশ্নের জবাবে কার্ল মার্কস উত্তর দিয়েছিলেন, 'স্পার্টাকাস'। রোম সভ্যতা থেকে ইউরোপিয় নতুন রোম সভ্যতার (আমেরিকা) উত্থান রোম সভ্যতার নতুন অভ্যূদয় মানুষ দেখেছে। এখানেও একজন ক্রীতদাস বুক চেতিয়ে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে চেয়েছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্য আমেরিকা তার অচেনা, অজানা দেশ। ইতিহাসে আলেক্স হেলির পূর্বপুরুষ গাম্বিয়ার জুফুরি গ্রামের সাধারণ দাস-অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী মানুষ কুন্টা কিন্টের স্থান স্পার্টাকাসের মতোই বিপ্লবী ও ঐতিহাসিক বরং আরও বড়। কেননা, দাস হওয়া সত্ত্বেও স্পার্টাকাসের ভূখণ্ড ছিল রোম। আমেরিকা কুন্টা কিন্টের দেশ তো নয়, ভূখণ্ডও নয়। স্মৃতির দেশে, স্মৃতির ভূখণ্ডে বসবাস করে তিনি বাতলে দিয়েছেন- দেশ, ধর্ম, শৈশব কিভাবে আগলে রাখতে হয়, বাঁচাতে হয়। মনোজগতে রেখে দিতে হয় মা-মাতৃভূমি, জনক, জন্মভূমি। জননী ও জন্মভূমির প্রতি কি পরিমাণ ভালোবাসা, দায়বোধ, অচেতন প্রেম কুন্টা কিন্টে মনোজগতের শিরায় শিরায় জমিয়ে রেখেছিল তা আমরা দেখি 'শিকড়ের সন্ধানে' উপন্যাসের অক্ষরের বিম্বিত বেদনায়। মানুষকে সেই ষোল শতকের বেদনা যদি এই শতকেও বহন করতে হয়, তহালে সভ্যতা সভ্যতা বলে স্বর্ণধাতু বলি রৌপ্য ধাতু বলি চিৎকার পেড়ে কোন লাভ নেই। কেননা, আমেরিকা নামের পীত দানবের দেশটি আরও বেশি দানব হয়ে উঠেছে। মার্কসবাদী ব্রিটিশ ঐতিহাসিক কিয়ার্নান আমেরিকা নিয়ে দারুণ এক মন্তব্য করেন। তিনি বলেন আমেরিকা ভাবতে ভালোবাসে যে, সে যা চায়, গোটা মানবজাতি তা-ই চায়।
এ জগতে ইতিহাস রচনার অধিকার একমাত্র বিজয়ী পক্ষের নয়। নিপীড়িত জনের রচিত ইতিহাসও কোন কোন ক্ষেত্রে মহত্তর হয়ে ওঠে।(আলেক্স হেলি-শিকড়ের সন্ধানে, অনুবাদ, গীতি সেন, পৃষ্ঠা- ২৪০)
শিকড়ের সন্ধানের বাংলা অনুবাদ করেছেন গীতি সেন। এই বইটি অনুবাদ করা এত সহজ ছিল না, এর জন্য মানবিক নিবেদন, দায়িত্ববোধ, ভালোবাসা থাকতে হয়; থাকতে হয় অপরিসীম ধৈর্য। গীতি সেনের সব ছিল তাই বাংলা ভাষায় আমরা এই মহাকাব্যিক ঐতিহাসিক বইটির অনুবাদ পেয়েছি।
তথ্যসূত্র :
১. লেওপলদ সেদর সেঙ্গর, অনুবাদ, মঞ্জুষ দাশগুপ্ত, বিশ শতকের ফরাসি কবিতা, আটজন কবি, সম্পাদনা- পুস্কর দাশগুপ্ত, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য কালক্যুতা ভারত।
২.বব মার্লি, ÔSlave drivers’-
৩. বব মার্লি, ÔRedemption song’
৪. (Bury My Heart at Wounded Knee- An Indian history of the American West-by Dee Brown- আমাকে কবর দিও হাঁটুভাঙার তীরে- আমেরিকার দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলীয় রেড ইন্ডিয়ানদের ইতিহাস, মূল ডি ব্রাউন, অনুবাদ-দাউদ হোসেন)।
৫. গ্রিক দর্শনের ইতিহাস, ডব্লু. টি. এস, অনুবাদ: ড. রশিদুল আলম, নওরোজ সাহিত্য সংসদ, প্রথম প্রকাশ ফেব্রুয়ারি ২০০৬ খ্রিষ্টাব্দ, কাকলী প্রকাশনী, ঢাকা, বাংলাদেশ।
৬. ভোলতেইকরা বা ‘উপজাতির ক্ষতচিহ্ন’, অনুবাদ মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, আফ্রিকান সাহিত্য-২, প্রথম প্রকাশ মার্চ, ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দ, কাগজ প্রকাশন, ঢাকা, বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা : ৩০৩।
৭. গেওর্গি প্লেখানভ, শিল্প ও সমাজ জীবন, ভাষান্তর কমলেশ চৌধুরী, দীপায়ন, ২০ কেশব সেন স্ট্রিট,কলকাতা. ভারত।
৮. বাংলাদেশ : জাতীয় অবস্থার চালচিত্র, সলিমুল্লাহ খান, বাণিজ্য বিচিত্রা প্রকাশনী, প্রথম প্রকাশ, এপ্রিল ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দ,ঢাকা, বাংলাদেশ, প্রকাশক, শহীদুল্লাহ পাটোয়ারী।
৯. আমি রিগোবার্তা মেনচু, মূল, রিগোবার্তা মেনচু, অনুবাদ : দাউদ হোসেন,সংঘ প্রকাশন, প্রথম সংস্করণ ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দ, ঢাকা, বাংলাদেশ।
১০. স্পেন, ১৯৩৬-১৯৩৭, গৃহযুদ্ধের পরিসরে নৈরাষ্ট্রবাদী গণউদ্যোগ, গাস্তঁ লেভাল, অগস্তিন সোউচি, সাম ডলগফ, আনতনি বিভর, সম্পাদনা ও অনুবাদ : বিপ্লব নায়ক, প্রকাশক, অন্যতর পাঠ ও চর্চা, কলকাতা, ভারত।
১১. কান্টের দর্শন, রাসবিহারী দাস, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, প্রথম প্রকাশ, জুন ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দ, কলকাতা, ভারত।
১২. এডওয়ার্ড ডব্লিউ সাঈদের অরিয়েন্টালিজম, ভূমিকা ও ভাষান্তর ফয়েজ আলম, রেমন পাবলিশার্স, প্রথম প্রকাশ ফেব্রুয়ারি ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দ, ঢাকা, বাংলাদেশ।
১২. যন্ত্রণার উত্তরাধিকার, অনুষঙ্গ অনুবাদ : পরিমল ভট্টাচার্য, অবভাস, প্রথম প্রকাশ অক্টোবর ২০১০ খ্রিষ্টাব্দ, কলকাতা, ভারত।
১৩. লুই বোনাপার্টের আঠারোই ব্রুমেয়ার, কার্ল মার্কস, বাংলাদেশ অনুবাদ সংসদের পক্ষে সংহতি, প্রথম সংহতি সংস্করণ ফাল্গুন ১৪১৫ বঙ্গাব্দ, ফেব্রুয়ারি ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দ ঢাকা, বাংলাদেশ।
১৪. রেভারেন্ড জন নিউটন।
১৫. রুটস : দ্য সাগা অফ অ্যান আমেরিকান ফ্যামিলি।
রুটসসের চরিত্রসমূহ:
original protagonist: a young man of the gvbwWbKv RbMY, grows up in Mvw¤^qv before being captured and enslaved.. আমেরিকায় ‘টবি নামে পরিচিত হন।
জন ওয়ালার ইনি কুন্টাকে কিনে নেন
ড. উইলিয়াম ওয়ালার ঔষধ এবং জনস ভাইয়ের ডাক্তার : তার থেকে সরে কুন্টা ক্রয়
বেল ওয়ালার cook to the doctor who Kinte marries
কিজি ওয়ালার Kinte এবং বেল কন্যা
মিসি ড. ওয়ালার ভাগ্নী
টম লি slave owner in North Carolina to whom Kizzy is sold
জর্জ লি – son to Kizzy and her brutal new owner, he is called ‘Chicken George’
ম্যাটিলডা who George marries
টম হার্ভে চিকেন জর্জ এবং মাটিল্ডা পুত্র
সিনথিয়া the youngest of Tom and Irene’s eight children (grand daughter of Chicken George)
বার্থা সিনথিয়া সন্তান; অ্যালেক্স হেলের মা সাইমন আলেকজান্ডার হেলি Cornell University professor and husband of Bertha; father of Alex Haley
অ্যালেক্স হেলি বইটির লেখক যিনি বইয়ের শেষ ৩০ পৃষ্ঠায় মূল চরিত্র ছিলেন, এই চরিত্র কুটা কিন্টের ষষ্ঠ উত্তরপুরুষ।
১৬.দাসের পৃথিবী- সৈয়দ আমিরুজ্জামান, কালের খেয়া, সমকাল, ০১ নভেম্বর ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দ।
১৭. শিল্পবোধ ও শিল্পচৈতন্য, প্রথম প্রকাশ: আগস্ট, ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দ, ভাদ্র, ১৩৯০ বঙ্গাব্দ, মুদ্রণ : উষা আট প্রেস, ঢাকা, বাংলাদেশ।
১৯. ভাষা ক্ষমতা ও আমাদর লড়াই প্রসঙ্গে, ফয়েজ আলম, প্রথম প্রকাশ মার্চ ২০২১ খ্রিষ্টাব্দ, নাগরী, সিলেট।
২০. বইটির বাংলা অুনবাদক: গীতি সেন, গীতি সেনের প্রতি বাঙালি জাতি কৃতজ্ঞ। তার অনুবাদ মূলকে শুধু স্পর্শ করে নাই, ভাষাকে গতিও দিয়েছে। মূল বিষয়বস্তুর প্রতি পাঠককে নিয়ে যাওয়া কৃতিত্ব গীতি সেনেরেই।
