ফয়েজ আলমের চিন্তা ও সৃষ্টিবিশ্ব একটি পর্যালোচনা

ফয়েজ আলমের চিন্তা ও সৃষ্টি বিশ্ব একটি পর্যালোচনা

জর্জ লুকাচের একটি উদ্বৃতি দিয়ে এই লেখাটি শুরু করতে চাই,‘শিল্প, প্রশংসার যোগ্য তখনই, যখন তা ওই যুগের বিরোধিতা করে’। এই তত্ত্ব আমাকে টেনে ধরেছে চুম্বকের মতো। আমি সংশ্লেষের আনন্দে ডুবেছি, জগতকে আবিস্কার করার জন্য পেয়ে গেছি যথার্থ অস্ত্র-তত্ত্ব। আমার কাছে তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে উত্তর ঔপনিবেশিক মানুষের লড়াই, জীবন, শ্রেণির সংগ্রাম। উপনিবাসের কালে যে মানুষগুলো দাসের জীবন যাপন করেছে, তাদের মধ্যে আলোকিত হয়ে উঠা প্রাজ্ঞজন ইতিহাসের সত্যাসত্যকে উল্টে দিতে শুরু করে। অপর করে দেয় প্রতিবেশি আপনজনদের। তারা অনালোকিত, বর্বর, অসভ্য এই বয়ানের মাধ্যমে, ইতিহাসের কাঠগড়ায় তাদেরকে আসামী করে। আমরা এখন জানি, এই বিষয়-বয়ান সত্য ছিল না, তারা ইংরেজি ভাষা না জানলেও উর্দু, আরবি, মাতৃভাষা বাংলা, ফার্সি ভাষা ভালো করেই জানতো। তাহলে কিভাবে তারা অনালোকিত ছিল! বাঙালি মুসলমান, বাঙালি হিন্দু এই দুই আপনাপন সত্তার মধ্যে বাঙালি হিন্দু ঔপনিবেশিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে, ঔপনিবেশিক শাসকদের সহযোগিতা করে। সেই সময় তাদের সমস্ত সাহিত্য, দর্শন তৈরি হয় নিজেদের কিভাবে যোগ্য দাস হিসেবে তৈরি করা যায় তার প্রতিযোগিতায়।

তার আপনে ধর্ম হয়ে উঠে বিচারের প্রধান অনুঘটক। সে ধারা এখনও বহমান, এখনও তারা অপর করে রাখে প্রতিবেশি আপনজনদের। শুধু ধর্মের কারণে একই পরিবেশে বেড়ে উঠেও, একই সঙ্গে বসবাস করেও, প্রতিদিন দেখা-সাক্ষাত বা কথা বলেও ঐতিহাসিকভাবে তারা অপর হয়ে যায়। রূপ তার অরূপের প্রতিহিংসায় ডুবে যায়। ইতিহাস থেকে দর্শন, লোকসমাজ থেকে নগর জীবনের অখণ্ড সমগ্রকে তারা খণ্ড খণ্ড করে ফেলে। ভিন্ন-ধর্মের মানুষগুলো কেবলই অপর বা শত্রু হয়ে উঠে তা না, নিজে ধর্মের লোকেরাও অপর হয়ে যায়। ‘উত্তরউপনিবেশি মন’ ‘বুদ্ধিজীবী তার দায় ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্বে’ ফয়েজ আলম নিজেদের সাবজেক্ট মনে করা আলোকিত বর্ণবাদী, স্বৈরচারিদের বিষয়ীর বিরুদ্ধে তথ্য ও তত্ত্বের মধ্য দিয়ে বাঙালির অখণ্ড বা সমগ্র ইতিহাস, দর্শনকে ইতিহাসের সঠিকতায় উপস্থাপন করার জোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। এতে করে আলোকিত বর্ণবাদী-স্বৈরচারিদের পুরোনো বিষয় বা বয়ান সম্পূর্ণ বাতিল হয়ে যায়, আধুনিক সময়ের আয়নায় ভেসে উঠে নতুন বিষয় বা বয়ান। যে সময়ের আয়না আলোকিত বর্ণবাদী ও স্বৈরচারেরা ভেঙ্গেচুরে চুরমার করে দেয়। যেন কেউ আর ইতিহাসের মুখ দেখতে না পারে। এর জন্য তারা ব্যয় করে তাদের সমগ্র জীবনের অর্জিত জ্ঞান। কিন্তু ফয়েজ আলম বা জনগণ তা মেনে নেব কেন? বুদ্ধির মুক্তি বা বাঙালি রেনেসাঁ পুরুষেরাও আধুনিক বর্ণবাদী ও বর্ণচোরাদের এই বিষয় ধরতে পারেনি। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের চিন্তাবিদরা নতুন বাস্তবতা তৈরির সম্ভাবনা দেখালেও তারাও একই চিন্তার ঘরানা থেকে বের হয়নি। যাকে আমরা বলতে পারি, এলিটিসিজম, সামন্তীয় অবশেষ বর্তমানের পুঁজিবাদের রূপ-অরূপ। তাই আমাদের বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন বাঙালির চিন্তাবিশ্বে অত বেশি নতুন অভিঘাত তৈরি করতে পারেনি। বাঙালি মুসলমানের যতটুকু চিন্তা করার ক্ষমতা অর্জিত হয়েছে তাতে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের সবচেয়ে বেশি অবদান থাকা সত্ত্বেও। প্রাচ্যবাদী ও ঔপনিবেশিক পণ্ডিতদের এই বর্ণবাদী বয়ান আফ্রিকান চিন্তাবিদ, লেখক, দার্শনিকরা যতটুকু ধরতে পেরেছিলেন প্রাচ্যের চিন্তাবিদরাও পারেনি এমন নয়, তবে জাত্যাভিমান এখানে তা বেশিদূর তাদের এগিয়ে যেতে দেয়নি। দক্ষিণ অফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ ধর্মযাজক ডেসমন্ড টুটু ঔপনিবেশিক শাসক ও ধর্মযাজকদের সম্পর্কে এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন: ‘সাদা চামড়ার দেবতাতুল্য লোকগুলো যখন এল, তখন তাদের হাতে ছিল বাইবেল আর কালো মানুষদের অর্থাৎ আমাদের হাতে ছিল মৃত্তিকা, জমি। ওরা বললো চোখ বন্ধ কর, ঈশ্বরকে ভাব, ধ্যানস্থ হও। আমরা বন্ধ করলাম আমাদের চোখ, তারপর চোখ খুলে দেখি ওদের হাতে আমাদের ভূমি, আর আমাদের হাতে শুধুই একখানা বাইবেল।’ (আফ্রিকার সাহিত্য সংগ্রহ ০২, সম্পাদনা- শিরনারায়ন রায়, শামীম রেজা প্রথম প্রকাশ মার্চ-২০০৪, কাগজ প্রকাশন, ভূমিকা পৃ. ১৩)

সে ঔপনিবেশিক কালের কথা, উত্তর ঔপনিবেশিক কালের কথা কি সাম্প্রচারিক জাতীয়তাবাদ, মৌলবাদ, হিন্দুত্ববাদ, সাম্রাজ্যবাদ এবং উগ্রবাদ সমাজ, রাষ্ট্রকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ফেলেছে। সাধারণ মানুষের বা নিজ দেশের মানুষের চিন্তার মুক্তির বদলে তারা নিজেরা আরও বেশি ঔপনিবেশিক চিন্তার জালে আটকে পড়েছেন।
যে কারণে মননের ঔপনিবেশিকতা থেকে ঔপনিবেশিত দেশগুলোর একাডেমিক মানুষ বের হতে পারেনি, সেই একই কারণে তারও বেশি অজ্ঞতায় ইন্টারনেট আবিস্কারের পর ফেসবুক, তোমার টিউব, কি খবর, এক্স, টেলিগ্রাম সামাজিক মিডিয়াগুলো সাধারণ মানুষকে মননের ঔপনিবেশিকতায় আরও বেশি আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ফেলেছে। বাংলাদেশের অনেক বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে আলাদা করে এই বিষয়গুলি নিয়ে বদরউদ্দিন ওমর, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ফরহাদ মজহার, সলিমুল্লাহ খান, ফয়েজ আলম নিজেদের মতো করে সাবজেক্ট বা বিষয় তৈরি করেছেন, ব্যক্ত করেছেন নিজেদের অভিমত। এই প্রবন্ধ যেহেতু ফয়েজ আলমকে নিয়ে লেখা, তাই আমি ফয়েজ আলমের বুদ্ধিবৃত্তিক জগত নিয়ে সীমাবদ্ধ থাকবো। দীর্ঘদিন ধরে ফয়েজ আলম তার প্রবন্ধে, আলোচনায়, কবিতায়, উত্তর ঔপনিবেশিক মানুষের রাজনৈতিক, সামাজিক, আঞ্চলিক, নাগরিক ও লোকজীবনের ইতিহাসের সূত্রসন্ধান করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। ‘নোংরা আর বিষ দিয়ে নয়, বরং আমরা মৌচাক ভরে তুলতে চাই মধু দিয়ে, মোম দিয়ে। আর এভাবে মানব জাতিকে আমরা দেই মহত্তম দুটি জিনিস, মিষ্টতা আর আলো।’ (জোনাথন সুইফট, বইয়ের লড়াই, নাউম ইওরিশ, মৌমাছি ও মানুষ, মির প্রকাশন মস্কো, অনুবাদক মাহবুবুল হক, বাংলা অনুবাদ- ১৯৮৮,প্রকাশলকাল -১৯৭৭)
ফয়েজ আলম তার অনুসন্ধানী দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে হাজার বছরের ইতিহাসকে তুলে আনেন নতুন নয় সঠিক রূপে। ইতিহাস ও জনগোষ্ঠীকে একই সঙ্গে গেঁথে দেন তিনি। ওদের মত নোংরা দিয়ে নয়, তিনি ইতিহাসের এই নতুন বিষয়কে ভরে তুলতে চান মোম, মধু ও মিষ্টতা দিয়ে। আর এভাবে তিনি অপর হয়ে উঠা বা করে দেওয়া তার জাতিসত্তার টিকুজি সন্ধান করেন। ইতিহাসে শুধু বিষয়ী নয় বিষয়ও মানে শ্রেণিও। তাই তার কাজ অনেক কঠিন।

আশ্চর্যের বিষয় ফয়েজ আলমের কবিতার বই ‘ব্যক্তির মৃত্যু ও খাপ খাওয়া মানুষ’ কবিতাটি আধুনিক সময় এবং এই বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতারণার বিরুদ্ধে একটি সংবেদনশীল প্রতিবাদও। এটি কেমন! পাঠক বিস্মিত হতে পারেন। কিন্তু বিষয়টি মানব দর্শনের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে, পুঁজিবাদী সমাজে মানুষ তো সেই কবে মরে গেছে। মানুষ যন্ত্রের নাটবল্টুতে পরিণত হয়েছে। হাইডেগারের দর্শনের সঙ্গে ফয়েজ আলমের দর্শন মিলে যাওয়ায় অবাক হওয়ার কিছু নেই। দর্শন ও জ্ঞানের জগতে মানুষের বোধশক্তি বা ভাবনা কতদিক থেকে ফাংশান করে তা কল্পনা করা যায় না। সেখানে গতানুগতিক চিন্তার কোনো স্থান নই। তাই হাইডেগার বলছেন, ‘আধুনিক মানুষ যন্ত্রের নাটবল্টুতে পরিণত হয়েছে।’ সামন্তীয় কালের শিক্ষা ব্যবস্থায় মানবিক প্রদীপ একটু হলেও নিভু নিভু জ্বলতো, বুর্জোয়া শিক্ষা ব্যবস্থায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের মেকলের সিলেবাসে পড়ুয়া কিছু আধুনিক নরপিশাস তৈরি হয়েছে। যারা মুখে এক মনে এক এই বোধ নিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রে মানুষে মানুষে বিভাজন তৈরি করেছে না, শুধু, তাদের ব্রাহ্মণ্যবাদী মৌলবাদী উপনিষদীয়, বেদের অহঙ্কারের মনন দিয়ে ভারতবর্ষকেও ডুবিয়ে দিয়েছে, আজকের দিনেও, অপর পক্ষে ইতিহাসের নতুন ভূমিতে যাদের বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে, ম্লেচ্চ, যবন, নমশুদ্র, মুসলমান তারাও সময়কে কতটা গ্রহণ করতে পেরেছে তাও তিনি বলছেন।
এই পুঁজ জমিয়ে রাখা শ্রেণির কাছে পরাজিত হয়েছে সাধারণ মানুষ। এই নিষ্ঠুরতার মধ্য দিয়ে ব্যক্তির মৃত্যু ঘটেছে, সমাজ গতানুগতিকতার কবলে ডুবেছে। খাপ খাওয়া চিন্তাহীন মানুষ সাধারণ মানুষ একপাল গরু-বা মহিষের পালের মত বুঝতেই পারেনি জীবনের আ্রও কয়েটি জীবন-সত্য আছে, নতুন বক্তব্য বা আলাপ আছে নিজেদের ইতিহাস আছে।

ফয়েজ আলমের বিষয় শুধু এই যুগের বিরোধিতা করেনি, তিনি অতীতের বিষয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন, তাদের সচেতন গলদ বা ভুলগুলি বা অপরাধকে তিনি শনাক্ত করেছেন। একজন গবেষকের লেখকের আবিষ্কারের বিষয় এর চেয়ে বড় কিছু হতে পারে না। আমি যদি ইতিহাসের সত্যাসত্য বিষয়ে এমন আবিষ্কার করতে পারতাম, কতোই না সৌভাগ্যের অধিকারী হতে পারতাম। ফয়েজ আলম অবশ্যই সেই সৌভাগ্যের অধিকারী একই সঙ্গে বাঙালি মুসলমান কৃষক, জেলে জুলা, শ্রমিক, সাবঅর্লটান যে জাতিসত্তা তারাও সৌভাগ্যবান। বাঙালি জাতিসত্তার মধ্যে তিনটি ধর্মের লোক বসবাস করে না অনেকগুলি জনজাতিও বসবাস করে। গবেষকরা এই দিকেও তাদের কোনো দৃষ্টি দেয়নি। শুধু অপর বা আদার করে দেওয়া ছাড়া এলিটদের একাডেমিক শিক্ষিকতদের নতুন কোনো অবদান আমরা হারিকেন দিয়েও খুঁজে পাচ্ছি না। তারা তাদের প্রয়োজনে যে ইতিহাস নির্মাণ করেছে আমরা সেই ইতিহাসকে হাজির নাজির মনে করেছি। কিন্তু ফয়েজ আলম তার বুদ্ধিবৃত্তির লড়াই থেকে সেই ইতিহাসের ঐতিহাসিক অপরাধীদের চিহ্নিত করেছেন, শনাক্ত করেছেন। শুধু শনাক্ত করলে হবে না, আমাদের নতুন বিষয়, সঠিক বিষয় দাঁড় করাতে হবে। তার জন্য লড়াই অপরিহার্য। ফয়েজ আলম এবং আমরা সেই লড়াইয়ে নেমেছি।

আমাদের ঘুরে দাঁড়াতে হবে। চিন্তা, বোধ, চৈতন্য, দর্শন, শিল্প, সাহিত্য, লোকসংস্কৃতি, নাগরিক সংস্কৃতি, সমাজিক জীবন, রাষ্ট্রীয় জীবনের শুদ্ধতার জন্য, সবকিছুকে সঠিকতায় স্থাপন করার জন্য, আমাদের যুথবদ্ধ লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। সম্প্রচারিক মিডিয়ার সঙ্গে দিতে হবে সমানে-সমানে ফাইট। ‘ফ্রেমে বাঁধাই করা অর্থাৎ ঘেরের মধ্যে আনার সার হচ্ছে নিজের উপস্থিতির সত্যটিকে বিস্মৃতিতে ঠেলে দেবার জন্য নিজের ফাঁদেই তাকে ফেলা। এই ফাঁদে ফেলা ক্রিয়াটি ছদ্মবেশে আসে কেননা যা কিছু উপস্থিত হয় তাকেই এ এক স্থায়ী আমানত করে তোলে আর সেই আমানত রূপেই আধপিত্য করতে থাকে।’ (মার্টিন হাইডেগার, দি টানির্ং, উইলিয়াম লভিটের ইংরেজি অনুবাদ থেকে, দি টার্নিং থেকে ভাষান্তর: কণকপ্রভা ব্যানার্জী, এবং মুশায়েরা মার্টিন হাইডেগার বিশেষ সংখ্যা পৃ. ২৬৩)

ভারতবর্ষ বহুজাতির দেশ। ভারতীয় দেবত্বে আরোপিত সনাতনী সমাজের চিন্তা, দর্শন, ধর্ম হিন্দুত্বের প্রভাবে যে সভ্যতা গড়ে উঠেছিল তার ইতিহাস বর্ণপ্রথার, বর্ণভেদের। সে সভ্যতা তছনছ হয়ে যায় মুসলমানদের ভরতবর্ষের আগমনের মাধ্যমে। একেশ্বরের সাম্যের সামাজিক প্রথা প্রচলনের মাধ্যমে। মুসলমান আসার আগে পদ্ধতিগতভাবে ভারতের ইতিহাস কেউ লিখেনি। লোকপরম্পরার মাধ্যমে তা ভারতীয় মননে ও মুখে মুখে প্রচারিত ছিল। মুসলমানরা আসার পর ভারতের জীবানাচারে একটি মৌলিক চঞ্চলতা তৈরি হয়। ফয়েজ আলম এ গতির সন্তান। ভারতীয় আধুনিক ইতিহাসবিদ রোমিলা থাপার থেকে শুরু করে ইরফান হাবিব, হুমায়ুন কবির, আর সি মজুমদার হয়ে আজকে যারা ভারতীয় ইতিহাসের প্রাচীন কাল থেকে আধুনিক কালের সন্নিবেশিত ঘটনার সত্যাসত্য নির্ধারণের জন্য সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন ফয়েজ আলম তাদের মধ্যেই পরিগণিত ও ব্যতিক্রম। কেননা, তিনি তাদের ঐতিহাসিক গলদকে পাঠকের সামনে উন্মোচন করে দিয়েছেন। আমি এখানে ফয়েজ আলমকে বড় করছি না। তাঁর কাজই তাঁকে সেই কাতারে নিয়ে যাচ্ছে। কেননা, কারও বড় করার জন্য আমি লিখি না। আমি লিখি সমাজের জন্য, মানবজাতির মুক্তি ও কল্যাণের জন্য, সেজন্য সাহস করে বলতে পারি আমাদের ইতিহাস, দর্শন, শিল্প, সাহিত্য আমাদের মনন দিয়ে আমাদের নতুন করে দেখার সময় পার হয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের চিন্তা ও মনন গঠেেন ফয়েজ আলমের ভূমিকা অপরিহার্য। যেমন কলকতার বুদ্ধিবৃত্তি থেকে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের চিন্তার প্রসারণ, বিকাশে আহমদ ছফা, আহমদ শরীফ, বদরউদ্দিন ওমর, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ফরহাদ মজহার, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শওকত আলী, সলিমুল্লাহ খান, পঞ্চাশ ও ষাটের কবিকূলসহ যারা জীবন দিয়ে জীবন ছেনে অক্ষরের বিম্বিত রেখায় নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন।

ফয়েজ আলম তাদের থেকেও একটু ভিন্ন। বাংলাদেশের উত্তরউপনিবেশি ভাবচর্চার ইশতেহার তিনি রচনা করেন। বাংলাদেশে তিনিই উত্তরউপনিবেশি ভাবচর্চার সূচনা করেন। ২০০৫ সালে ফয়েজ আলম অনুবাদ করেন এডোওয়ার্ড সাঈদের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘অরিয়েন্টালিজম’। এর পর পরই বের হয় তার তাত্ত্বিক প্রবন্ধগ্রন্থ ‘উত্তরউপনিবেশি মন’ যে বইটিকে বলা যায় উপনিবাসের শাসকদের প্রশ্রয়ে উনিশ শতকে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাংলা ভাষার উপর সংস্কৃতের আগ্রাসন এবং সংস্কৃতিনুযায়ী বাংলা তৈরির ইতিহাস তিনি বিশ্লেষণ করেন সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষিত থেকে। তিনি দেখান, এভাবে ভাষা হারানোর কারণে বাঙালির আসল ইতিহাস সংস্কৃতি, সাহিত্য, কিচ্ছা-কাহিনি, সামাজিক বিষয সবই চিরতরে হারায়। জায়গা করে নেয় উনিশ শতকের কলিকাতার সাম্প্রদায়িক আবেগের দোষে দুষ্ট ইতিহাসের হিন্দিকরণের ভাষ্য। তিনি বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষের কমন ‘মান কথ্যবাংলা’কে সাহিত্যসহ সব ধরনের লেখালেখির মাধ্যম করার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বিকাশের ধারা বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে তিনি দেখান এই বিষয়টিই সঠিক। মান কথ্যবাংলাকে লেখার ভাষা হিসাবে ব্যবহারের কথা এখন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ২০১০ সালে সমকাল-কালের খেয়ার মনোনয়নে স্বাধীনতার পর থেকে এ যাবত বাংলাদেশের সেরা পঞ্চাশ গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হয় তার ‘উত্তরউপনিবেশি মন’ বইটি।

ফয়েজ আলম বাংলাদেশের শিল্প সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তার জগতে সৃষ্টিশীল জ্ঞানসাধক। বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ভাবুকদের অন্যতম হিসেবে বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে বিচার্য। তিনি একেধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, অনুবাদক, উত্তরউপনিবেশি তাত্ত্বিক। বাংলাদেশের বহু তরুণের উত্তরউপনিবেশি সক্রিয়তার হাতেখড়ি ফয়েজ আলমের ভাবধারা ও চিন্তাচর্চা প্রভাব পরিলক্ষিত। উত্তরউপনিবেশি তত্ত্বচর্চার এই জায়গায় ফয়েজ আলম সৃষ্টিশীল।

তাঁর প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ কবিতার সঙ্কলন, ফয়েজ আলমের প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা চৌদ্দটি। সমকালীন চিন্তায় আলোড়ন তোলা বা তরুণ প্রজন্মের লেখকদেরকে নয়া ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ করার বিচারে ফয়েজ আলম খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তার প্রকাশিত বইসমূহ, ‘ব্যক্তির মৃত্যু ও খাপ খাওয়া মানুষ’ (কবিতা- ১৯৯৯), ‘প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি’ (গবেষণা-২০০৪), এডওয়ার্ড সাইদের অরিয়েন্টালিজম (অনুবাদ- ২০০৫), উত্তরউপনিবেশি মন (প্রবন্ধ ২০০৬), কভারিং ইসলাম (অনুবাদ ২০০৬), ভাষা, ক্ষমতা ও আমাদের লড়াই প্রসঙ্গে (প্রবন্ধ ২০০৮), জ্যাক দেরিদা: পাঠ ও বিবেচনা (সম্পাদনা ২০০৮), বুদ্ধিজীবী,তার দায় ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব, (প্রবন্ধ ২০১২), এডোওয়ার্ড সাইদের নির্বাচিত রচনা সম্পাদনা-(জলছাপে লেখা কবিতা ২০২১-২০২১), রাইতের আগে একটা গান (কবিতা ২০২২), ভাষার উপনিবেশ: বাংলা ভাষার রূপান্তরের ইতিহাস (প্রবন্ধ ২০২২), বাঙালির ইতিহাস চর্চার পথের কাঁটা (২০২৩)।

‘তবে আমি এই আলোচনা শুরু করতে চাই বিরুদ্ধতার অপেক্ষাকৃত সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলিকে আলাদা করে চিহ্নিত করার মাধ্যমে, কারণ তার মধ্যে দিয়ে বিরুদ্ধতাকে চেনা যেতে পারে। যারা বিরুদ্ধতা প্রকাশ করেছেন, তাঁরা কিন্তু সবক্ষেত্রে নিজেদের বিরুদ্ধতাকারী হিসেবে ঘোষণা করেন না। এমনকি কোনও কোনও ক্ষেত্রে কোন মাত্রায় বিরুদ্ধতা প্রকাশ করছেন, সে বিষয়ে তাঁরা নিজেরাও পুরোপুরি সচেতন থাকেন না। বিরুদ্ধতাকে চিহ্নিত করার অন্যতম নিশ্চিত পন্থা হতে পারে সামজে অপরে’র উপস্থিতিকে চিহ্নিত করা। এর ফেলে চিহ্নিত করার কাজটি সহজসাধ্য হয়, অপরে’র সঙ্গে বিরুদ্ধতার যোগসূত্র টানা যায়।’ (রোমিলা থাপার- বিরুদ্ধতার স্বর বেদে সময় থেকে শাহিন বাগ, প্রতিক্ষণ, কলকতা, প্রথম বাংলা অনূদিত সংস্করণ মে -২০২৩)।


এই জাতীয় আলোচনা মোটা দাগে ব্যক্তির প্রশংসা হয়ে ওঠে। আমি আসলে ব্যক্তির প্রশংসা করতে চাইনি। কেননা, পাণ্ডিত্যের বিষয় এবং ভাবনার বিষয়ের পার্থক্য অনুধাবনের জন্যে প্রাজ্ঞ ব্যক্তির সংখ্যা খুবই নগন্য। এ রকম বন্ধুত্ব থেকেই কয়েকজন সম্ভবত ভাবনার কলায় অভিযাত্রী হয়ে উঠে, তাদের মধ্যেই অদেখা একজন হয়ে উঠতে পারে ফয়েজ আলম, আহমদ ছফা, সলিমুল্লাহ খান, ফরহাদ মজহার বা অন্য কেউ। আমি এই আলোচনা শুরু করেছিলাম বিরুদ্ধতার বা অপর করে দেওয়ার ভারতীয় সনাতন হিন্দুত্ববাদের দর্শনের বিরুদ্ধে। যেটি আামাদের শিখিয়েছেন আহমদ ছফা, ফয়েজ আলমদের মতো লেখক, কবি সংবেদনশীল জ্ঞানসাধকবৃন্দ। আমি শেষ করতে চাই দ্বান্দিক প্রক্রিয়া মধ্যদিয়ে ইতিহাসকে বিচার করতে হবে এই কথা বলে। ‘ইতিহাস তোমাকে লজ্জা দিতে পারে, কিন্তু ইতিহাস তোমার চৈতন্য তৈরি করে দেবে।’