বোদলেয়ারের কাব্য প্যারিসের প্লীহা (প্যারিস সপ্লিন) : সলিমুল্লাহ খানের অনুবাদ মানবিক সংবেদন ও প্রফেটিক বেদনা

পাণ্ডিত্যের বিষয় এবং ভাবনার বিষয়ের পার্থক্য অনুধাবনের জন্য
প্রাজ্ঞ ব্যক্তির সংখ্যা খুবই নগণ্য
ভাবনার ক্ষেত্রে যদি ইতিমধ্যেই থাকে বিরুদ্ধবাদীরা
নিছক প্রতিপক্ষরাই নন শুধু
ভাবনার বিষয়টি হবে আরও সুযোগ্য
জলভরা মেঘের ফোঁকর দিয়ে যখন
হঠাৎ আকাশে ছড়িয়ে পড়ে সূর্যের আলো
ঝলমল করে ওঠে মেঠো পথ
এ রকমের বন্ধুত্ব থেকেই কয়েকজন সম্ভবত
ভাবনার কলায় অভিযাত্রী হয়ে ওঠে
গ্রীষ্মের প্রথম সকালে যখন
গোপন গ্রাম্য পথে ফুটে একটি নার্শিসাস এবং
পাহাড়ি গোলাপ দীপ্ত হয় মেপলের বনে
সারল্যের হঠাৎ ঝলকানি

(মার্টিন হাইডেগার- দি পোয়েট এস এ থিংকার, কবি যখন ভাবুক- অনুবাদ উদয়শংকর বর্মা)

সলিমুল্লাহ খান দেশে বিদেশে প্রায় চল্লিশ বছর ধরে নানা বিষয়ে লেখালেখি সেমিনার, বক্তৃতা, অনুবাদ, টেলিভিশন ও ইউটিউবসহ নানা মাধ্যমে জ্ঞানবিতরণ করে যাচ্ছেন। তাঁর সেমিনার ও বক্তৃতার বিষয় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষিত তরুণদের মাঝে কিছুটা বোঝাপড়া হয়েছে বলে মনে করি। লিখেছেন অনেক বইও। কিন্তু সেসব বিষয় নিয়ে লেখালেখি, বিশ্লেষণ, আলোচনা-সমালোচনা খুবই কম হয়েছে। ভবিষ্যতে এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হবে এ প্রত্যাশা করি। এতদিন আমরা বিদেশিদের কাছ থেকে জ্ঞান আমদানি করেছি, আশা করি ভবিষ্যতে বিদেশিদের কাছে আমরা জ্ঞান রপ্তানি করতে পারবো। নিজেরা জ্ঞানচর্চায় সমৃদ্ধ হয়ে, এদেশে জ্ঞানের সঙ্গে শুদ্ধ প্রজ্ঞাকে জড়িয়ে; মানবিক সদিচ্ছার আনন্দ ও বেদনা বুকে নিয়ে অতীশের-আহমদ ছফার এদেশ সভ্যতার মহিমায় আবারও নতুন করে নাম লেখাবে এই আশা করতে পারি। এই স্বপ্ন বুকে নিয়ে আমরা পথ চলি, পথ হাঁটি- পথের মধ্যে কাঁটা, কঙ্কর, বালি, কাদা, পথে ধাক্কা খাই, রক্ত বের হয়, নখ উঠে যায়, মাথাব্যথা করে, চোখে ঝাঁপসা দেখি। কিন্তু নাছোড় বান্দা আমরা- স্বপ্ন মরে না, স্বপ্ন মরতে দিই না, স্বপ্ন ঘুড়ি হয়ে উড়ে আর বেদনায় পুড়ে। পথে ফুটপাতে পড়ে থাকা উসখু-খুসকো চুল, ময়লা জামা, মুখে অপার্থিব নূরের স্নিগ্ধ সুন্দর বেদনার দরবেশ তাদের স্বচ্চ চোখের দিকে তাকাতে ভয় হয়, তাকাতেই পারি না। মনে হয় আমার অপরাধ, পাপ, আমার প্রতারণা, দু-নম্বরি, সুবিধাবাদ তাদের চোখের আয়নায় ধরা পড়ে যাবে, আমি তাড়াতাড়ি তাদের পাশ কাটিয়ে আসতে পারলে বাঁচি। এরা পৃথিবীর পিলার, নির্লোভ, উদাসীন, না খেয়ে থাকে, মাটির ইটের বিছানায় ইট মাথা দিয়ে শুয়ে থাকে। আমি তাদের বন্ধু হতে গিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়েছি। তবুও মনে মনে আমি তাদের বন্ধু করে নিয়েছি। পথে ভিক্ষুক, বেদের মেয়ে, নতুন ভিক্ষুকের দল, হিজড়া ভিক্ষুক, হকার, ভবঘুরে, পথে বাস, ট্যাক্সি, রিক্সা, প্রাইভেট কার। এসব নিয়ে লেখার কেউ নেই, এদের দেখার কেউ নেই। প্যারিস সপ্লিন বা প্যারিসের প্লীহাতে এসব বিষয় নিয়ে কবিতা লিখেছেন বোদলেয়ার। আর সে কবিতার সংশ্লেষিত মানবিক অনুবাদ করেছেন সলিমুল্লাহ খান। কি অসাধারণ বোদলেয়ারের জীবন বীক্ষণ, ইন্দ্রিয় ঘ্রাণশক্তি। সে সময়ের সুশীল সমালোচক, খ্রিষ্টীয় মরালিটির সৌন্দর্য বোধ নিয়ে তলস্তয়, গতিয়ে, হুগোসহ অনেক বিখ্যাত কবি লেখক সমালোচক মানুষের প্রতি বোদলেয়ারের এই দরদ বুঝতে পারেনি। সমসাময়িক ও তার পরের সময়ে কয়েকজনই মাত্র তা বুঝতে পেরেছিল। এ বিষয়গুলো পাঠকদের বুঝার সুবিধার্থে আমি বিস্তারিত আলোচনায় যাব। তাই লেখাটি অনেক বড় হয়ে যেতে পারে।
মার্টিন হাইডেগারের ভাষায়, জলভরা মেঘের ফোঁকর দিয়ে যখন, হঠাৎ আকাশে ছড়িয়ে পড়ে সূর্যের আলো, ঝলমল করে ওঠে মেঠো পথ, এ রকমের বন্ধুত্ব থেকেই কয়েকজন সম্ভবত, ভাবনার কলায় অভিযাত্রী হয়ে ওঠে’।
আমি এ ভাবনার কলায় অভিয়াত্রী হতে চাই। তাই ড. সলিমুল্লাহ খানসহ জ্ঞানচর্চার আরও সেমিনার, বক্তৃতা, আলোচনা, লেখা প্রবন্ধ-নিবন্ধ, কবি ও কবিতা, অনুবাদ, দর্শনের নানা বিষয়ে অনুসন্ধিৎসু হয়ে অন্বেষণে নেমে পড়ি। আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান দিয়ে যতটুকু বুঝতে পারি ততটুকু বোঝার চেষ্টা করি। আমার সৃষ্টিশীল মন জ্ঞানের সংবেদে মিশে যায়। আমার ভাব ও বস্তু মন প্রত্যেকটি সেমিনার আলোচনা থেকে হৃদ্ধ হয়। শিল্পী সলিমুল্লাহ খানের প্রফেটিক বেদনা আমাকে ব্যথিত করে। সে বেদনায় আমিও পুড়ি। মানবজাতির বেদনার ভাষা বুঝতে পারা কত কঠিন, যারা বুঝেছে তারা ছাড়া কেউ তা সহজে অনুধাবন করতে পারবে না। শিল্প সাহিত্য দর্শন ইতিহাস মতবাদ প্রসঙ্গে তিনি মানবজাতির দায় ও দায়িত্ব নিয়ে কথা বলেন। তিনি হয়ে উঠেন গিলগামেশের বংশধর, বেদনার বংশধর। তারও আগে এ জগতে যারা গিলগামেশের বংশধর ছিল ড. সলিমুল্লাহ খান তাদের বোধিবৃক্ষ তলে আমাদের ডুব দিতে উসকে দেন; ধ্যানের মুদ্রায় জ্ঞানের সঙ্গে হৃদয় মিশে যেতে থাকে। আমরা মিশে যাই, চোখ বন্ধ করে ধ্যান করি, আবার চোখ কান খোলা রেখে সতর্ক হই। এমন প্রফেটিক ও মানিবক বেদনায় পুড়ে যাওয়া গিলগামেশের বংশধর ফরাসি দেশের কাব্যসন্তান শার্ল পিয়ের বোদলেয়ার। বোদলেয়ারের জন্ম ৯ এপ্রিল ১৯২১, মৃত্যু ৩১ আগস্ট, ১৮৬৭ খ্রিষ্টাব্দে। এই শতাব্দী পৃথিবীর ইতিহাসের নতুন বাঁক বদলের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সেই নতুন বাঁকবদলের সন্তানেরা শিল্প নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা সমালোচনা কথাবার্তা বলতে শুরু করেছিলেন। শিল্পর জন্য শিল্প, মানুষের জন্য শিল্প এসব বিষয় নিয়ে গেওর্গি প্লেখানভ- (শিল্প ও সমাজ জীবন- ভাষান্তর, কমলেশ চৌধুরী, দীপায়ন, ২০ কেশব সেন স্ট্রিট, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ জানুয়ারি -২০০৫ খ্রিষ্টাব্দ) লিও তলস্তয়, (হোয়াট ইজ আর্ট বা শিল্পের স্বরূপ, দ্বিজেন্দ্রলাল নাথ, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষৎ-১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দ), আর্নস্ট ফিশার (দি নেসেসিটি অব আর্ট- শফিকুর রহমান, সংঘ প্রকাশন, ঢাকা, খণ্ডিত সংস্করণ ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দ), লেনিন- (সাহিত্য প্রসঙ্গে, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দ), শিবনারয়ান রায় (কবির নির্বাসন স্রোতের বিরুদ্ধে-মডেল পাবলিসিং, কলকাতা ১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দ) ঈসকাইলস শেলি (প্রমেথিউস, প্রসঙ্গ, অনুবাদ ও অনুসঙ্গ দেবনাথ বন্দোপাধ্যায়, প্যাপিরাস, ২ গণেন্দ্র মিত্র লেন, কলকাতা, প্রথম সংস্করণ, জানুয়ারি ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দ)সহ বি˜গ্ধজন অসংখ্য প্রবন্ধ, নিবন্ধ, বই প্রকাশ করেছেন। শিল্পের সূত্রে ফভিইজম থেকে উত্তর উপনিবেশবাদ্ পর্যন্ত অতৃপ্ত শিল্পীরা কত ঘাটের পানি খেয়েছেন তার কোন হিসেব নেই। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে হেসেয়দ তাঁর বিখ্যাত কাব্য থেওগনিতে প্রমিথিউস আখ্যানের বর্ণনা দিয়েছেন। লোক মানুষের মুখে মুখে বর্ণিত সেই কাহিনির নায়ক প্রমেথিউস কি দেবতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে নাই। ছলেবলে কৌশলে তিনি মানুষকে তুলে দিয়েছিলেন যজ্ঞবলির শ্রেষ্ঠাংশ আর আগুন। শিল্পের মধ্য দিয়ে দেব পিতাদের সঙ্গে দাসদের জয় যাত্রা এই যে শুরু হলো তা কিন্তু থেমে থাকেনি। ঈসকাইলাস (৫২৫ -৪৫৬ খ্রিষ্টপূর্ব) তাকে বন্দি করে ফেলেন। আনুমানিক ৪৬০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি লিখেন বন্দি প্রমিথিউস। ঈসকাইলাস প্রমেথিউসকে নিয়ে তিনটি নাটক লিখেন তৎমধ্যে বন্দি প্রমেথিউস আমাদের পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। এর মধ্যে পৃথিবীর ইতিহাসে ঘটে গেছে নানা ঘটনা। শিল্পীর মনোভুবনে যেহেতু প্রমিথিউস বন্দি হলো- লোকমানুষ বা দাস মানুষের মনোভুবন বন্দি হয়ে পড়লো। ‘ঈসকাইলস লিখেছেন প্রমিথিউস বন্দি ছিলনে তেরোপুরুষ কাল ধরে, তাঁকে মুক্ত করেন জিউসপুত্র হারকিউলিস। এটি সিরিয়ার কাহিনি, সিরিয়া হয়ে গ্রিকে পৌঁছে। কিন্তু জগতে প্রমিথিউস বন্দি হলেন ঈসকাইলাসের হাতে ৪৬০ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দে। তাঁর মুক্তি হল আধুনিক রোমান্টিক যুগে ১৮২০ খ্রিষ্টাব্দে। সুদীর্ঘ দুহাজার দুশো আশি বছর বন্দি থাকার পর ক্লাসিক যুগের বীর নায়ক প্রমেথিউসকে মুক্তি দিলেন রোমান্টিক যুগের হারকিউলিস, কবি পার্সি বিসি শেলি (১৭৯২-১৮২২ খ্রিষ্টাব্দে)। যুগান্তরের এক বন্দিকে মুক্তি দিয়ে ১৮২০ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশ করলেন শেলি তাঁর চার অঙ্কে সমাপ্ত বিখ্যাত রোমান্টিক গীতিনাট্য ‘প্রমেথিউস আনবাউন্ ‘। এতে যে প্রমেথিউস মুক্তি পেল তা নয়, শেলিও মুক্তি পেল; আর মুক্তি পেল জগতও। ‘ফরাসি বিপ্লবের মন্ত্রগুরু রুশো বলেছিলেন, ‘মানুষ স্বাধীনসত্তা নিয়ে জন্মগ্রহণ করলেও সর্বত্র পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ। সুতরাং মানুষের কর্তব্য হল সেই পরাধীনতার বন্দিশৃঙ্খল ছিন্ন করে জন্মগত স্বাধীনতা অর্জন করা।’ শেলি ক্লাসিক যুগের বন্দি প্রমেথিউসকে এই প্রতীকী তাৎপর্যে মুক্তি দিলেন। তিনি স্বীকার করলেন না গ্রিক পুরাণকথিত এবং ঈসকাইলাস-অনুসৃত প্রমেথিউস-মুক্তির পুরোনো কাহিনি বন্ধনকে, বিশ্বাস করলেন না স্বৈরচারী শক্তির সঙ্গে মুক্তিকামী বিদ্রোহীর কোনোরকম আপোশ সম্ভব। এক্ষণে এখানে একটু থামি। আধুনিক যুগে যারা শিল্পের জন্য শিল্পের নিয়ে কথা বলে তাদের সঙ্গে মানুষের জন্য শিল্প নিয়ে যারা কাজ করে তাদের আপস কি করে সম্ভব! সম্ভব নয়।

তাই তলস্তয় তার হোয়াট ইজ আর্ট বইয়ে প্রথম পর্বেই এই শিল্পের জন্য শিল্পের অসারতা, নিষ্ঠুরতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন। কিন্তু সুবিধাবাদী শিল্পীগোষ্ঠী শিল্পীর সে বেদনা বুঝতে পারেনি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘রাশিয়ার শিল্পের পৃষ্ঠপোষকতার উদ্দেশ্যে (যেখানে জনসাধারণের প্রত্যেককে শিক্ষার সুযোগ দেবার জন্য প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র শতাংশ ব্যয়িত হয়) সরকার, সংস্কৃতি পরিষদ, সঙ্গীত শিক্ষায়তন, এবং থিয়েটারগুলিকে কোটি কোটি রুবল অনুদান দিয়ে থাকেন। ফরাসি দেশে শিল্পের জন্য দুই কোটি ফ্রাঁ নির্দিষ্ট আছে। অনুরূপ পরিমাণ সরকারি অনুদান জার্মানিতে এবং অন্যত্র ও দেওয়া হয়ে থাকে।


প্রত্যেক বড় শহরে, যাদুঘর, সাহিত্য পরিষদ, সঙ্গীত বিদ্যালয়, নাট্য বিদ্যালয় এবং অভিনয় ও কনসার্টের জন্য অতি বৃহৎ হর্ম্যরাজি নির্মিত হয়ে থাকে। শিল্পের দাবি মেটাবার জন্য লক্ষ লক্ষ শ্রমিক, রাজমিস্ত্রি, চিত্রী, কাঠমিস্ত্রি, কাগজ সজ্জাকার, দর্জি, কেশবিন্যাস শিল্পী, জহুরি, ঢালাইকর, মুদ্রণ সহায়ক কঠোর পরিশ্রমে তাদের সমগ্র জীবন ব্যয় করে। একমাত্র সামরিক বিভাগ ছাড়া মানবিক কর্মের আর কোন বিভাগেই এত শক্তি ব্যয়িত হয় না। এই কাজে শুধু যে বিপুল পরিমাণ শ্রমই ব্যয় হয় তাই নয়, যুদ্ধের মতো এতেও বহুমনুষ্য জীবন বিসর্জিত হয়ে থাকে। শিশুকাল থেকে লক্ষ লক্ষ পদসঞ্চারী শিক্ষায় (নৃত্যশিল্পী), অতি দ্রুত সংগীতের সুর এবং বাদ্যযন্ত্রের কৌশল আয়ত্ত করবার জন্য অথবা বর্ণানুলেপনেচিত্র রচনা এবং দৃষ্ট বস্তুর রূপ দানের কাজে (চিত্রশিল্পী), অথবা প্রত্যেকটি বাক্যাংশের ওলট-পালট ঘটানো এ প্রত্যেক শব্দের মিল আবিষ্কারে সমস্ত জীবন নিয়োজিত করে। এই সব লোক অনেক ক্ষেত্রে হৃদয়বান ও কুশলী এবং সর্বপ্রকার প্রয়োজনীয় কাজে দক্ষ হলেও বিশেষ একজাতীয় ও বুদ্ধি- বৈনাশিক কাজের চর্চায় বর্বর সদৃশ হয়ে ওঠে এবং একপেশে আত্মসন্তুষ্ট স্পেশালিস্টে পরিণত হয়। জীবনের সকল গভীর দিক গুলির প্রতি এদের কোন উৎসুক থাকে না, একমাত্র পা ঘোরাবার কায়দা অর্জনে এবং জিহ্বা ও আঙুল চালাবার কৌশল আয়ত্ত করাতেই তারা দক্ষতা অর্জন করে। কিন্তু এভাবে মানব জীবনকে খর্ব করাও শোচনীয়তম ব্যাপার নয়। ইউরোপ এবং আমেরিকার রঙ্গমঞ্চে যে সমস্ত নতুন নাট্যাভিনয় হয়, সেরূপ একটি নতুন নাট্যাভিনয়ের মহড়ায় আমি একবার উপস্থিত ছিলাম মনে পড়ে। আমি সে প্রেক্ষাগৃহে উপস্থিত হবার আগেই প্রথম অঙ্কের অভিনয় শুরু হয়ে গিয়েছিল। প্রেক্ষাগৃহে পৌঁছাবার জন্য আমাকে রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ পথের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল। অনেক অন্ধকার পথ ও দরজা অতিক্রম করে মঞ্চের দৃশ্য এবং আলোকসজ্জা পরিবর্তনের কাজে ব্যবহৃত বিরাট বিরাট যন্ত্রের পাশ কাটিয়ে আমাকে নিয়ে যাওয়া হল একটি প্রকাণ্ড ভবনের ভূগর্ভস্থ কক্ষের মধ্য দিয়ে। সেখানে অন্ধকার এবং ধূলার মধ্যে আমি শ্রমিকদের প্রচণ্ড কর্মব্যস্ত দেখলাম। এদের মধ্যে এক ব্যক্তি বিবর্ণ, চোখ মুখ বসা, ময়লা জামা গায়ে, কর্ম ক্লান্ত ময়লা হাত ও আড়ষ্ট আঙুল, দেখলেই মনে হয় সে অত্যন্ত ক্লান্ত এবং বিরক্ত; সে আমার পাশ দিয়ে ক্রুব্ধভাবে আর একজনকে বক্তে বক্তে চলে গেল। অন্ধকার একটি সিঁড়ি বেয়ে আমি মঞ্চের দৃশ্যসজ্জার কাঠের পাটাতনের ওপর এসে পৌঁছালাম। হরেক রকমের খুঁটি, চক্র এবং ইতস্তত বিক্ষিপ্ত দৃশ্যসজ্জার অংশ-বিশেষ এবং অলঙ্করণ ও পর্দার মধ্যে শ’য়ে শ’য়ে না হলেও কয়েক ডজন রঙ-মাখা আঁটো পোশাকে সজ্জিত ব্যক্তিকে দাঁড়ানো এবং ইতস্তত সঞ্চরমাণ অবস্থায় দেখতে পেলাম। এ ছাড়া এদের মধ্যে আমি কতকগুলি স্ত্রীলোকও দেখলাম যারা প্রায় নগ্ন। এরা সকলে গায়ক গায়িকা, ঐকতানের অংশ গ্রহণকারী, অথবা যৌথনৃত্যের নর্তকী। এরা প্রতীক্ষায় ছিল কখন এদের পালা আসবে। আমার পথ নির্দেশক আমাকে রঙ্গমঞ্চের ওপর নিয়ে গেল এবং একটি পাটাতনের সেতুর সাহায্যে অর্কেষ্ট্রা বাদক দলের মধ্য দিয়ে আমাকে আমার নির্দিষ্ট আসনে নিয়ে গেল। সে দলের মধ্যে নাকাড়া থেকে বাঁশি এবং বীণাবাদক শখানেক সর্বজাতীয় যন্ত্রীর সমাবেশ দেখেছিলাম। একটু উঁচুতে প্রতিফলকসহ দুটি বাতির মাঝখানে এবং সঙ্গীত মঞ্চের সম্মুখে স্থাপিত একটি আরাম কেদারায় সঙ্গীত দলের নির্দেশক বসেছিলেন। তার হাতে একটি খুদে লাটি (বেটন)- যার সাহায্যে তিনি ঐকতান বাদকদল এবং গায়কদের নির্দেশ দিচ্ছিলেন। সাধারণভাবে বলা যায়, সমস্ত নাট্যাভিনয়ের পরিচালক ছিলেন তিনি। তখন অভিনয় শুরু হয়ে গেছে। অভিনয় মঞ্চের ওপর একটি নববধূকে গৃহে আনা উপলক্ষে ভারতীয়দের একটি শোভাযাত্রা দেখা গেল। অভিনয়সজ্জা পরিহিত নরনারী ছাড়াও সাধারণ পোশাক পরিহিত দুজন লোক ব্যস্তসমস্ত হয়ে রঙ্গমঞ্চের ওপর দ্রুত ছোটাছুটি করছিল। এদের মধ্যে একজন অভিনয়াংশের নির্দেশক। নরম জুতো পরে অপর যে ব্যক্তি অসাধারণ দ্রুত পায়ে এখান থেকে ওখানে দৌড়ে বেড়াচ্ছিলেন তিনি নৃত্যশিক্ষক। এদের মাসিক মাইনে দশজন শ্রমিকের সারা বৎসরের আয়ের চাইতে বেশি।
তলস্তয় বলছেন, ‘যে শিল্প মানুষের বা শ্রমিকদের থেকে এত বেশি পরিমাণ শ্রম দাবি করে মানবজীবনকে খর্ব করে এবং মানবিক প্রেমের বিরুদ্ধে অপরাধ করে, সে শিল্পের কোন স্পষ্ট এবং দৃঢ়বদ্ধ সংজ্ঞাই যে শুধু নির্দিষ্ট হয়নি তা নয়, বরং শিল্পসেবীদের মধ্যেই সে শিল্পের অর্থ এতই স্ববিরোধী যে, শিল্প বলতে তারা কি বোঝাতে চায় তা বলা কঠিন বিশেষ করে সৎ এবং প্রয়োজনীয় শিল্প কী সে বিষয়ে ধারণা আরও শক্ত। এ হেন পরিস্থিতিতে শিল্পের জন্য যে এত মূল্য দেওয়া হচ্ছে তা কোন্ যুক্তিতে ক্ষমার্হ, তা বিচার করে দেখতে হবে’।


বলতে পারি মানুষ বা শ্রমিক- শিল্প বা শিল্পী থেকে মানবিক কোন কিছু কি আশা করতে পারে না! শিল্পের জন্য শিল্প নিয়ে যারা মশগুল তাদের কাছে এটা তলস্তয়ের প্রশ্ন। তলস্তয় মুক্তি দিয়েছিলেন তার সময়কে-। লেনিন বলেন, তলস্তয় মারা গেছেন, আর মহাশিল্পীর দর্শনে প্রকাশ পেয়েছে এবং তার রচনাবলীতে চিত্রিত হয়েছে যে বিপ্লবপূর্ব রাশিয়ার দুর্বলতা আর অক্ষমতা সেটা তার সঙ্গে হয়ে পড়েছে অতীতের বস্তু। কিন্তু যে উত্তরাধিকার তিনি রেখে গেছেন তার মধ্যে রয়েছে এমন বস্তু যা অতীতের জিনিস হয়ে পড়েনি, যা ভবিষ্যতের। বোদলেয়ার নিয়েও তলস্তয়ের বীক্ষণ আছে, সে সময়ের ইউরোপীয় শিল্পের গতি প্রকৃতি নিয়ে তলস্তয় যথেষ্ট ভেবেছেন। তলস্তয় বলেন , ‘বোধগম্যতা হৃাস। ক্ষয়িষ্ণু শিল্প। সাম্প্রতকি ফরাসি শিল্প। এই শিল্পকে মন্দ বলার অধিকার আমাদের আছে কি সর্বোচ্চ শিল্প স্বাভাবিক নিকট সর্বদাই উপলব্ধিগম্য। স্বাভাবিক প্রকৃতির ব্যক্তিকে সংক্রমণে অসমর্থ বস্তু শিল্প নয়। বিখ্যাত Fleur du mal -ভূমিকায় থিয়েফল গতিয়ে Theophileg Gatuire বলেছেন, বোদলেয়ার কাব্যের জগৎ থেকে বাগবিভূতি, আবেগ এবং সত্যের একনিষ্ঠ অনুকৃতিকে নির্বাসিত করেছেন। ব্দোলেয়ার ভের্লেন, মালর্মে, জাঁ মোরয়া, আঁরি দ্য রেনিয়েসহ এ রকম অসংখ্য কবিকে নিয়ে ফরাসি দেশের সমালোচক ডুমিক (Dumice) ব্যাপক সমালোচনা করেছেন। যিনি এ মতবাদ গ্রহণ করেন নি। তিনি বলেন, এভাবে নতুন গোষ্ঠীর কবিদের মধ্যে অস্পষ্টতা একটা মতবাদে উন্নীত হল। নতুন কবি গোষ্ঠী যে মতবাদকে কার্যত একটি অন্ধবিশ্বাসে উন্নীত করেছেন সে বিখ্যাত ‘অষ্পষ্টতা তত্ত্বে’র অবসান ঘটাবার সময়ও এসে গেছে।’ তলস্তয় বলেন, শুধু ফরাসি লেখকেরা এ পর্যায়ে চিন্তা করেননি, অপরাপর সকল দেশের কবিরাও অনুরূপ চিন্তা এবং কর্মধারর পরিচয় দিয়েছেন যথা জার্মান, স্ক্যান্ডনেভিয়, ইতালি, রুশ এবং ইংরেজ। চিত্রশিল্প, স্থাপত্য, সঙ্গীত প্রভৃতি সকল শাখার শিল্পীরাও এ পন্থা অনুসরণ করেছেন। নীট্শেএবং ভাগনারের ওপর নির্ভর করে নতুন যুগের শিল্পীরা এ সিদ্বান্তে উপনীত হয়েছেন যে, তাদের পক্ষে স্থুলবুদ্ধি জনসমাজের নিকট সুবোধ্য হওয়া অপ্রয়োজনীয়। এসব বিষয় নিয়ে তলস্তয় তার হোয়াট ইজ আর্টে অনেক উদাহরণও দিয়েছেন। আমরা সেদিকে যাব না। দেখবো তলস্তয়ের এই আধুনিক অনুভব নিয়ে লেনিন কি বলছেন, লেনিন বলছেন, ‘শাসক শ্রেণিগুলোর বিরুদ্ধে তলস্তয়ের অভিযোগ প্রচণ্ড শক্তিশালী এবং অকৃত্রিম; গির্জা, আইন আদালত, সমরবাদ, আইনগত বিবাহবন্ধন, বুর্জোয় বিজ্ঞান ইত্যাদি যেসব প্রতিষ্ঠানাদি দিয়ে আধুনিক সমাজ বজায় থাকে সেগুলোর ভিতরকার মিথ্যাচার তিনি একেবারে স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন। কিন্তু আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার কবরখনক প্রলেতারিয়তের জীবন কর্ম এবং সংগ্রামের একেবারে বিরুদ্ধ প্রতিপন্ন হয়েছে তার মতবাদ।’ বোদলেয়ারের কবিতার অনুবাদ প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে এত বিষয়ের অবতারণা করেছি, এসবের মধ্যে আসল বিষয় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পাঠক আমাকে প্রশ্ন করতে পারেন। আমি যে বিষয়টি বুঝেছি তা আপনাদেরও বুঝাতে চায়। তাই এই গৌরচন্দ্রিকা এই দীর্ঘ অবতারণা। আমাকে ক্ষমা করতেও পারেন, গালিও দিতে পারেন। কেননা, বোদলেয়ার আধুনিক কালের মুক্ত প্রমেথিউস। তলস্তয় যে বিষয়টি ধরতে ধরতেও ধরতে পারেননি। জীবনের সেই বিষয় ও বিষয়ীতে রীতিমত জীবন-যাপন করেছেন বোদলেয়ার। প্রলেতারিয়ত বা সাবঅর্লটান সমাজের সঙ্গে মিশেছেন। জীবনের আধার ও আধেয় দুটিতে তিনি করেছেন অবগাহন। নগরের যে জীবন বড় লোকেরা ক্লেদ বা নোংরা বলেন তাদের একজন হয়ে উঠেছিলেন বোদলেয়ার। তাই তিনি Fleur du mal- এর মত কবিতা লিখতে পেরেছিলেন। রোমান্টিক বেদনায় মথিত হয়ে শিল্পের জন্য শিল্প আন্দোলন করেও তারা আবার সেটিকে প্রত্যাখান করেন। বোদলেয়ার কেন আধুনিকতার অনুভূতি ও বেদনার জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো তা আমাদের তলিয়ে দেখতে হবে। বোদলেয়ার সৃষ্টিশীলতার নিজস্ব ঘ্রাণশক্তি দিয়ে বুঝেছিলেন- জগত ভেঙ্গে পড়েছে, পৃথিবী নতুন প্রবাহের দিকে বাঁক নিচ্ছে। তথাকথিত খ্রিষ্ট্রিয় মরালিটি দিয়ে পৃথিবীকে যেভাবে ধর্ম, বিধান, তসবিহ দিয়ে ধ্বসে দেওয়া হয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে হবে। তাই তিনি স্বশরীরে ল্যাতিন পাড়ায় বাস করার সিদ্বান্ত নেন। ঐ সময় যেকোন তরুণের জন্য এটি ছিল এক দুঃসাহসিক সিদ্বান্ত। জীবনকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়ে জীবনকে দেখা। হৃদয়হীন নগরে এমন ঝুঁকি নিতে পারে সেই যে নিতে পারে ভাব ও বস্তু জগতের দায়িত্ব। আধুনিকতা কোন উড়ো উড়ো বিষয় নয়, আধুনিকতা হচ্ছে জগত ও জীবনকে তার প্রকৃতির মধ্য দিয়ে খুঁজে বের করা। পৃথিবীর অনেক দেশের কবিরা আধুনিকতার এ বিষয়টি বুঝতে পারেনি। যেটি নিয়ে তলস্তয়য়ের মত মহাশিল্পী হোয়াট ইজ আর্টে বইয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। প্লেখানভ তার ‘শিল্প ও সমাজ জীবন’ বইয়ে এ বিষয় নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন, তিনি বলেন, ‘ রোমান্টিকতাবাদীরা সত্যি সত্যি তাদের চারপাশে বুর্জোয়া সমাজের সঙ্গে একেবারে বেমানান ছিল। এটা ঠিক যে এর ফলে বুর্জোয়া সামাজিক সম্পর্কের কোনও বিপদের আশঙ্কা ছিল না। রোমান্টিক গোষ্ঠীগুলো বেড়ে উঠেছিল এমন সব তরুণদের নিয়ে, বুর্জোয়া সামাজিক সম্পর্কের প্রতি তাদের কোনও বিরোধিতা ছিল না, তাদের বিদ্রোহ ছিল বুর্জোয়া জীবনের অর্থলোলুপতা, একঘেয়েমী, নীচতার বিরুদ্ধে। নয়া শিল্পধারা, যার মধ্যে তারা গভীরভাবে নিমগ্ন ছিল, তা ছিল তাদের কাছে অর্থলোলুপতা, একঘেয়েমী ও নীচতার কবল থেকে মুক্তির উপায়। পুনরুত্থান পর্বের শেষের দিকে এবং লুই ফিলিপের রাজত্বের প্রথমার্ধ ছিল রোমান্টিকতাবাদের সেরা সময় আর এই সময়টুকু ফরাসি তরুণদের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কেননা, তারা বুর্জোয়া অর্থলোলুপতা, রসকষহীন জীবন ও একঘেয়েমির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছিল না। অথচ মাত্র অল্পকাল আগেই সমগ্র ফ্রান্স আলোড়িত হয়েছিল মহান ফরাসি বিপ্লবের প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড় এবং নেপোলিয়নের শাসনে যা যাবতীয় মানবিক ভাবাবেগকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।
অষ্টাদশ শতকের শেষে, ফরাসি বিপ্লবের প্রাক্কালে প্রগতিশীল ফরাসি শিল্পীরা তৎকালীন প্রচলিত সমাজের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেননি। ডেভিড ও তার বন্ধুরা ছিলেন পুরনো ব্যবস্থার শত্রু। কিন্তু এই অসামাঞ্জ ছিল নৈরাশ্যব্যঞ্জক। কেননা পুরোনো ব্যবস্থা ও তাদের মধ্যে সমঝোতার কোন সম্ভাবনা ছিল না। তাছাড়া রোমান্টিকি শিল্পী গোষ্ঠী ও বুর্জোয়া সমাজের মধ্যে যে গরমিল, সেটা ডেভিড আর তাঁর বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে পুরোনো ব্যবস্থার গরমিলের তুলনায় অনেক বেশি গভীর ছিল। ঢেভিড আর তার বন্ধুরা চেয়েছিল পুরোনো ব্যবস্থার উচ্ছেদ কিন্তু থিওফল গতিয়ে ও তার সহকর্মীদের মধ্যে বুর্জোয়া সামাজিক সম্পর্কগুলিতে আপত্তি ছিল না। তাঁরা শুধু এটাই চেয়েছিলেন যে বুর্জোয়া ব্যবস্থা থেকে বুর্জোয়া কদর্য অভ্যাসগুলো যেন না জন্মায়। প্রাচীন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেও কিন্তু ডেভিড এবং তার সঙ্গীরা এ ব্যাপারে সচেতন ছিলেন যে তাদের পেছনে ধাওয়া করে থার্ড এস্টেটের বাহিনি যা অ্যাবে সিয়েরি-র সুপরিচিত ভাষায়, অতি শীঘ্রই সবকিছু হয়ে উঠবে। রোমান্টিক ও পার্নাসীয়দের মধ্যে আমরা কিন্তু এ রকম কিছু দেখতে পাই না। তৎকালীন ফরাসি দেশের সমাজ-ব্যবস্থার কোনও পরিবর্তন তারা প্রত্যাশাও করেনি। সে রকম কোন আকাক্সক্ষাও তাদের ছিল না। সেই কারণে পারিপার্শ্বিক জীবন সম্পর্কে তাদের মনোভাব ছিল নৈরাশ্যজনক। শিল্পকলার অনুরাগী শিল্পী ও জনসাধারণ যখন তাদের সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে প্রবল বিরোধিতায় জড়িয়ে পড়ে, তখনই সৃষ্টি হয় ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ধরাণাটির।

১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দে ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের প্রবল ঝড় দেখা দেয়। ‘শিল্পের জন্য শিল্প’পন্থী ফরাসি শিল্পীরা এই ঝড় অগ্রাহ্য করেন। শিল্পের সার্বভৌম স্বাধীনতায় বিশ্বাসী শিল্পীর আদর্শ উদাহরণ রূপে উত্তরকালে গতিয়ে কর্তৃক উদ্বৃত বোদলেয়ার পর্যন্ত সঙ্গে সঙ্গে Le salut public বিপ্লবী পত্রিকা প্রকাশ করতে আরম্ভ করেন। অবশ্য এর প্রকাশ অনতিবিলম্বেই বন্ধ হয়ে যায়। দেরিতে হলেও, ১৮৫২ খ্রিষ্টাব্দে পিয়ের দ্যুঁপ ‘চ্যানসনে’র ভূমিকায় ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ এই তত্ত্বকে শিশুসুলভ বলে ঘোষণা করেছিলেন যে শিল্পের একটি উদ্দেশ্য থাকতে হবে। কেবল প্রতিবিপ্লবের জয়ই বোদলেয়ার ও তাঁর সমমনোভাবাপন্ন শিল্পীদের ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ ই শিশুসুলভ মতবাদকে চিরকালের জন্যে পরিবর্তন করতে প্রেরণা দিয়েছিল। পারনাসীয়দের ভবিষ্যৎ জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর অন্যতম ছিলেন লেকঁদে দ্য লিসলে, তিনি তাঁর পোয়েম অ্যান্টিকে’র ভূমিকায় সুস্পষ্টভাবে এ প্রত্যাবর্তনের মনস্তাত্ত্বিক গুরুত্ব তুলে ধরেন।
দ্বিতীয় সাম্রাজ্যের ফরাসি লেখকদের মধ্যে কয়েকজন প্রগতিশীল উদ্দেশ্য ব্যতীত সব কিছু থেকেই ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ নীতিকে প্রত্যাখান করেন। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় যে আলেকজান্দার দুমা স্পষ্টভাবেই বলেছিলেন যে ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ কথাগুলি অর্থহীন। যদিও তারা ছিল রক্ষণশীল নৈরাশ্যবাদী। চমৎকারভাবে রাসকিন এই বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘একজন কুমারী তার হারানো প্রেমের জন্য গান গাইতে পারে, কিন্তু একজন কৃপণ তার হারানো অর্থের জন্য গান গাইতে পারে না।’ শিল্প জ্ঞান প্রকাশের মাধ্যম। যত বেশি উন্নত অনুভূতি শিল্পে প্রকাশ পায়, ততই এই মাধ্যমটি তার কল্যাণকর ভূমিকা পালন করতে পারে। একজন কৃপণ কেন তার হৃত অর্থের জন্য গান গাইতে পারে না তার সহজ কারণ হচ্ছে তার হৃত অর্থের গান কাউকে বিচলিত করে না।

এই লেখায় এত উদাহরণ টানার একটা কারণ এই যে, এদেশের শিল্প চর্চারত সৃষ্টিশীল শিল্পী গোষ্ঠী মুখে মুখে বিপ্লব, বামপন্থা, বিপ্লবী বা মানুষের জন্য যারা শিল্প চর্চারত, করতে চাই, ভাবে, লিখতে চাই তাদের নাকচ করে দেন। এসব ভাবাবেগের মুর্খের দল বুঝতে পারে না, মানবজাতির আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে টিকে থাকা কত হাজার বছরের লড়াই সংগ্রামের ফল। আধুনিকতা বা উত্তরাধুনিকতা, উত্তর ঔপনিবেশিকতা সময়ের বুকে হঠাৎ উড়ে আসে নাই। এর জন্য মুক্তির মন্দির সোপানতলে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন, রক্ত, চিন্তা, প্রজ্ঞা, জ্ঞান কাজে লাগাতে হয়েছে। আমাদের দেশের কবি শিল্পীরা কথায় কথায় বোদলেয়ার আর বুদ্ধদেব বসুর উদাহরণ দেন। তাদের শিল্পের জন্য শিল্পের নায়ক মনে করেন। সলিমুল্লাহ খান কেন বোদলেয়ারের মত কবি নিয়ে মেতে থাকেন ইত্যাদি। তাদের জ্ঞ্যাথার্তে বলছিÑ বোদলেয়ার প্যারিস সপ্লিন বা প্যারিসের প্লীহা কবিতায় মানব জীবনের যে সুক্ষ্ম অসঙ্গতি, দরিদ্রের অসহায়ত্ব, নগর কর্পোরেটের বৈষম্য, মানবজাতির প্রতি বুর্জোয়াদের তামাশা তোলে ধরেছেন, সাবঅলটার্ন মানুষের দুঃখ দুর্দশাকে চিত্রায়িত করেছেন এখনও কেউ তার ধারে কাছেও যেতে পারেননি। সলিমুল্লাহ খান এদেশের তরুণদের এসব বিষয় যখন তুলে ধরছেন তাতে ঐ শ্রেণির ঘুম হারাম হয়ে গেছে। শিল্পের নামে করা তাদের অপরাধ ও এতদিনের অজ্ঞতা মিথ্যা চতুরতা ধরা পড়ে যাচ্ছে।
বোদলেয়ার কিছু কবিতা সলিমুল্লাহ খান অনুবাদ করেছেন। যার রস, টক, ঝাল, মিষ্টি, তিতা তিনি একা একা উপভোগ করেননি। তিনি এ বিষয়ে দায়িত্ব নিয়েছেন। অনুবাদ করার পর, বোদলেয়ার কবিতা নিয়ে তিনি সেমিনার দিয়েছেন। এই সেমিনারগুলো অনুসন্ধিৎসু তরুণদের শিল্পবোধকে কতটা শানিত করেছে যারা সেমিনারে অংশগ্রহণ করেছেন তারা জানেন। বলতে দ্বিধা নেই এই সেমিনার আমাকে জগতের শিল্পে নতুন জন্ম দিয়েছে। আমাদের দেশে সত্য কথা বলার লোক নেই বললে চলে। সব ক্যালকুলেটিভ-ডিপ্লোমেটিক। তাই আমাদের দেশের শিল্পের এই দশা। কিন্তু তা কেউ স্বীকার করবে না। সলিমুল্লাহ খানের অনুবাদ থেকে একটি কবিতা এখানে তোলে দিতে চাই
যেমন

গাড়িটি যখন বনভূমি পার হইতেছে তখন এক চাঁদমারির পাশে তিনি গাড়ি দাঁড় করাইতে বলিলেন। বলিলেন, মনে হইতেছে সময় ঘায়েল করিবার পক্ষে কয়েকটা গুলি খরচ করাই যুক্তিযুক্ত; আর ঐ দানবটা ঘায়েল করাই তো সর্ব সাধরণে পক্ষে সর্বাধিক স্বাভাবিক, সর্বোচ্চ বিধিসম্মত, কাজ! এই বলিয়াই তিনি তাহার প্রিয়তমা, মধুরতমা, আর অসহনীয়া স্ত্রীরত্নের উদ্দেশ্যে বীরপুরুষের হাত বাড়াইয়া দিলেন। এই দুর্বোধ্য নারীটির কাছে তিনি আপন জীবনের যাবতীয় দুঃখের ঋণে, আর হয়তোবা আপন প্রতিভার বড় একটা হিসসার ঋণেও ঋণী।
কয়েকটা গুলি লক্ষ্য উদ্দিষ্ট লক্ষ্য হইতে বেশ দূরে গিয়া পড়িল; এমনকি ছাদেও বিধিল একটা। স্বামীপ্রবরের অক্ষমতায় মনোহর প্রাণীটি হাসিয়া কুটিকুটি। আচমকা তাহার দিকে মুখ ঘুরাইয়া তিনি বলিলেন ‘ঐখানে, ঐ ডানদিকের পুতুলটা, ঐ বাতাস বরাবর নাক-সিটকানো আর খানিক উদ্বৃত স্বভাবের পুতুলটা দেখিতেছেন আচ্ছা প্রিয়তমা আমার- ধরিয়া লইলাম ঐটাই আপনি! দুই চোখ বন্ধ করিয়া ঘোড়া টিপিলেন তিনি; পুতুলের মাথাটা আচ্ছামত উড়িয়া গেল।
তাই তিনি তাহার প্রিয়তমা, মধুরস্বভাবা, অসহনীয়া স্ত্রীরত্নের আপনকার অনিবার্য আর অনমনীয় কলা দেবীর- উদ্দেশ্যে মাথা নত করিয়া আর শ্রদ্ধাভরে হস্তচুম্বন করিয়া যোগ করিলেন ‘আহা! প্রিয়তমা পরীরাণী আমার, এই লক্ষ্যভেদে সাহায্য বাবদ আপনাকে ধন্যবাদ জানাবার ভাষা কোথায় পাই!’
(বীর গোলন্দাজ, মূল বোদলেয়ার, অনুবাদ, সলিমুল্লাহ খান, প্যারিসের প্লীহা আগস্ট ৩০, ২০২২ সংবাদ প্রকাশ)

হৃদয় উচ্ছ্বাসের লোকপ্রিয় কবিতা সম্পর্কে বুঁর্গে দাবী করেন যে, জনগণের কল্পনা ও সংবেদনশীলতা’র অনুসন্ধান করতে হবে যাতে ‘স্বাভাবিক মহাকাব্যিক ঘটনাসমূহের জাদুর কাঠি’ সবকিছুকে এক বিক্ষুব্ধ অবস্থা ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে স্থাপন করতে পারে। প্রকৃতি কবিতাকে সংবেদনশীলতা ও অলীক কল্পনা বলয়ের ভাগ দেয়; বুদ্ধি ও যুক্তি বলয়ের ভাগ দেয় ভিন্ন এক নারীকে, সে নারী পদ্য সৃষ্টির কৌশল। ভাষা ক্ল্যালিসিজমের নিয়মকানুন চুরমার করে দেয় এবং এক নতুন স্বস্তিহীন বোধকে তৃপ্ত করতে অচেতন ও বন্যতার দিকে দৃষ্টি ফেরায়। চিন্তা আর পদ্যের পোশাক পরে নেই; চাতুর্য ও আড়ম্বর কবিতার প্রশংসিত গুণাগণ নয়; এখন শুধু প্রতিকল্পের পর প্রতিকল্প স্বপ্নীল, যুক্তিহীন, ভীতিকর পারম্পর্যতায় পরস্পরকে অনুসরণ করতে থাকলো।

আমরা আর্নস্ট ফিশারে মত এই অনুভবে আসতে পারি যে, ‘বোদলেয়ারের এই পর্বের কবিতা হলো সামাজিক ক্রান্তিকালের কবিতা। বুর্জোয়া জগতের ভেতর দিয়ে বয়ে যায় ক্ষয়িষ্ণুতার দমকা হাওয়া। সম্পদের ভেতর শূন্যতা, আবেগের ভেতর অবসাদ হা করে থাকে। কি করেত হবে স্বস্থানে থাকা না অজনার উদ্দেশ্যে স্থান ত্যাগ স্থির দাঁড়িয়ে থাকা নাকি সামনে অগ্রসর হওয়া রোমান্টিক বোদলেয়ারের মুত্যুর শরাণাপন্ন হয়। বিদ্রোহী বোদলেয়ার নাস্তির উপর নতুনের বিজয় নির্দেশ করে। বোদলেয়ার তার কবিতার আধেয় ও ভাষার মধ্য দিয়ে প্রকৃত সামজিক অবস্থার বিষয়ীগত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।

আমি ভাবনার কলার অভিযাত্রী হতে চাই। তাই বেদনার সন্তান হিসেবে জগতকলার এসব বিষয় নিয়ে ভাবি। সেই ভাবনা নতুন করে উসকে দেয় ড. সলিমুল্লাহ খানসহ জ্ঞানচর্চার আরও বেদনার বংশধরগণ। তরুণ বন্ধুরা আমাকে এগিয়ে যেতে বলে, তাদের সঙ্গে থাকি। প্যারিস সপ্লিন থেকে একটি কবিতা তোলে ধরে আমি লেখাটি শেষ করতে চাই। যেমন :
আমার সুন্দর সারমেয়, আমার সোনা কুকুর, আমার প্রিয় কুতুয়া, এগিয়ে এসে শোঁকো তো শহরের আতরওয়ালার কাছে কেনা অপূর্ব আতর’ কুকুরটা ওর লেঝ নাচিয়ে, আমার মনে হয় আদপে এই দুর্ভাগা প্রাণীদের হাসিও বক্রোষ্ঠির প্রকাশ। কৌতূহলবশত এগিয়ে এসে ওর ভেজা নাকটা এগিয়ে দিল আতরদানির খোলা মুখে। তারপর হঠ্যাৎই ভয় পেয়ে পিছিয়ে গিয়ে আমার দিকে চেয়ে ঘেউ ঘেউ করে উঠল, নিন্দে করার মত।

ওরে ও হতভাগা কুত্তা। তোকে যদি আমি একদলা বিষ্ঠা দিতাম তবে তুই মহানান্দে শুকতিস, হয়তো গিলেও নিতিস। তুই এমনই আমার বিষণ্ন জীবনের অযোগ্য সঙ্গী। তুই ঠিক ভিড়ের মতো, যাদের কোন সুগন্ধি দিতে নেই, ওতে ওরা অতিষ্ঠ হয়। ওদের দিতে হয় বাছাই করা বাহ্যি। (সারমেয় ও আতরদান, বোদলেয়ার, অনুবাদ গৌতম পাল)

বোদলেয়ারের দুশো বৎসরপূর্তি উপলক্ষে ড. সলিমুল্লাহ খান যে কবিতাগুলো অনুবাদ করেছেন তা বাংলার ভাষার অনুবাদ সাহিত্যে বিশেষ সংযোজন। তিনি সব সময় নতুন জ্ঞান নিয়ে চর্চা করতে চান, তাঁর জ্ঞানচর্চার প্রবণতার দিকে দৃষ্টি দিলে এটি বুঝতে সহজ হয়। প্যারিসের প্লীহা কবিতাগুলো নতুন রৌশনি ছড়াচ্ছে। যদিও এ কবিতাগুলো প্রায় দেড়শো বছর আগের লেখা। বাংলা ভাষায় অনুবাদও হয়েছে। সলিমুল্লাহ খানের ভাষায় পঞ্চাশ বছর পর পর ভালো কবিতা নতুন করে অনুবাদ হওয়া প্রয়োজন। আর যদি হয় বোদলেয়ারের মত বড় কবি তাহলে দায়িত্ব নিয়েই তা করা দরকার। সে তাগিদ থেকে তিনি অনুবাদে হাত দিয়েছেন। কিন্তু দুর্মুখের তো অভাব নেই। তাদেরকে বোদলেয়ারের কবিতা ‘সারমেয় ও আতরদান’ নিয়ে স্বাগত জানাতে পারি।