কবিতা
-
আমার নাম অপেক্ষা
আমার নাম অপেক্ষা আমার প্রথম জন্মে, প্রাণ হারালাম—বিশাল এক ঝড়ো হাওয়ায় দ্বিতীয়বার বুঝলাম, জন্মেছি অপেক্ষা করতে, করলাম; সেবার প্রাণ গেলো, নিষ্ঠুর এক মরণব্যাধিতে কাত্রে কাত্রে ধ্বংসের চুম্বন। পরের জন্মে ভাবলাম, এবার বাঁচবো বেশ কদিন; ওরা আমাকে গাছের সাথে বেঁধে আগুন দিলো আমি আর অশ্বত্থ— প্রাণ হারালাম ভীষন যন্ত্রনায়। এর পরের জন্মে আমি ছিলাম বিদ্রোহী সেবার…
-
ফাল্গুনী দাসের তিনটি কবিতা
উত্তম প্রেমিক চেয়ে ভুল করে হারিয়েছি মলিন মখমলে আনারকলির চাদর। সন্ধ্যাবেলায় ফুলকুমারীর ফুলেরা— টগবগে যুবকের বাহুতে গরম চায়ের ফেনা, ছিটকে পড়ে সারাদিনের ব্যথায় কাতর। চুড়ির ঘনত্বে টুংটাং শব্দ মাতিয়ে রাখতে পারো, এলোমেলো হাওয়ায় তীব্র কোলাহলের মেঘ। তবুও বাঁধো ঘর, শান বাঁধানো ঘাটে, সরষে ফুলের হলদে পাখিরা মিলে-মিশে একাকার। কচি ডগার কলাপাতার ফাঁকে ছিটকে পড়া বৃষ্টির…
-
শফিক মিলু-এর গুচ্ছ কবিতা
পরাবাস্তব প্রশ্নতা নিরাকার এই অপ অপচয় –রাত হয়ে এঁটে গেলে কবিতার ভোরেকবিতার গীতিময় ক্ষতে –জোছনার সাদাগীত ঢেলে দিয়ে জোছনার দূরে : হয় যদি নিরাকার উচাটন পাখি –আমি তবে খুশি হমু নাকি?হরিণের হাত :লিখে তাই করে ফেলি উপমা বেহাত?হরিণীর চলা :আমারে এড়ায়া গেলে আমিই নিষাদ? অনুভূতি তাই এতো শতাব্দীতমো?শতাব্দী-আল ধরে –হরদম হতে থাকে শতাব্দীপাত ? নাগরিক…
-
সহজ ইশতেহার
একবিংশ নাগর ও নাগরিক আমি ।গাছের পাতারা ঝরে গেলে প্রকৃতির মৌন গণভোটেভোটের মাহুল এলে মনোগামী –আমার প্রার্থীতা জানি এখনো ক্লাসিক হয়ে ওঠে । কোনো প্রৌঢ় নই – প্রৌঢ় নয়তো আমার এই পৌরসভা।দিকে দিকে সবুজের বুলেটিনে যথার্থ আমার ছবি।এই বক্তব্য-ব্যালটে যদি তোমার সম্মতিশোভাপাই – তুমি আমি যদি নিরঙ্কুশ প্রেমিক প্রেমিকা হই :এটা কোনো ফ্যাসিবাদ নয় –…
-
গুচ্ছ কবিতা
স্বদেশের মুখ পিঠের ওপর ঠেঁসে কলমের ডগাচেঁচিয়ে উঠছে অভিনেতার ভাষণ—তোমরা উন্নতিচিহ্ন অনুভব করোলিখেও জানাও চিত্র বেঢপ ভঙ্গিতেএমনটা হয় প্রায় বিবিধ উপায়েবাতাস আলাদা করা সম্ভব হয় নাহাওয়ার অন্তর থেকে। প্রতাপ-প্রবাহেযেন মরুঝঞ্ঝাঝড়— খুব তেড়ে আসে! বাস্তব হতেই চেষ্টা করছি। বস্তুতঅনেক খরচে তৈরি বাঁচার অভিধা,শক্তির বিরুদ্ধ শক্তি নীরব বারুদেযদিও জ্বালাল আলো— রক্ষাটি থাকে নাফ্যাকাসে পাঠক যাচ্ছে, ভূখণ্ড কোথায়!আমি…
-
মোস্তফা মোহাম্মদের একগুচ্ছ কবিতা
গজগামিনী রাধা বেশে এলোচুলে আলুথালু পায়,এলে বুঝি গজের দেবী নীল যমুনায়; সোমত্ত এক গোপবালা চৌধুরী নন্দিনী,পায়ে হেঁটে এলে তুমি গজের গামিনী; তোমায় আমি দেখি সোনা দূরবহুদূর,বুকে আমার বজাও বাঁশি বেদনাবিধুর; রক্তগোলাপ রক্তগোলাপ তুমি,ফুটে আছো হরিতলার মাঠ,নির্ঘুম রাতের আকাশ–নিরবতাভাঙা পাখি প্রাণেশ্বরী আমার; যায় দিন,যায় চলে যায়–আমাদের হয়নিকো দেখা কোনোদিন,মিছিলে যাবার আগে ক্লান্ত শরীর,উদাস প্রান্তরের গান সুখ-প্রদায়িনী;…
-
নিখোঁজ রাতের শিরোনাম
কার যেন নাম ছিল, চিহ্ন ছিল ঘরেরকারো নামে উড়েছিল কনকনে মাঘী বাতাসপৌষের শুকনো ধুলো দিনশেষে মেখেছিল বিনম্র শিশির- আনত আকাশের নির্যাস,কার নামে ঝরে পড়া পাখির পালক সোনারোদেরেখেছিল বিষন্ন নিশ্বাস। ছিল কি এমন কেউ?ছিল নাকি কারো – নাম লিখা রঙিন কপাটখিড়কি দুয়ারে দাঁড়িয়ে থাকা অংগীকার,বুনো ঝোপ কাঁটলতায় সময়েরা কাকে ভেবে অবকাশে নিয়েছিল ছুটি।কে যেন ধূসর কুয়াশায়…
-
তোফায়েল তফাজ্জলের দুইটি কবিতা
কৃতজ্ঞতাবোধ কৃতজ্ঞতাবোধ আছে পশুতে-পশুতে,পশুতে-মানুষেমানুষে-পুশুতে;এইসব গুণের চরম ঘাটতি মানুষে-মানুষে। দু’আনার কিছু করলেফিরিয়ে দেয়ার ইচ্ছায় মরিয়া পশুচার, ছ’আনা।দু’পায়ী দেখায় উল্টোটাই,এক গ্রামের জবাবে দেয় দশ গ্রাম ক্ষতি,দশ গ্রামে যোগ দশ গুণ।সেরাজীবে অ-সেরাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শায়েস্তা এরা ঘরে ঘরে ঢুকে গেছে।চুষে খাচ্ছে সোনালি সম্ভ্রম,পিন পতনের মতোশব্দটিও না থাকায়হীনবল মানুষেরশেষ সম্বল, রক্তও। এইসব জোঁকেদের মুখেলবণ ছিটিয়ে দাও,পারলে একটু লঙ্কার…
-
নিমাই জানার চারটি কবিতা
অধঃপতন ঘূর্ণন নখ জীবিত থুতু পায়ুদ্বার ও সুড়ঙ্গের জৈব ঘা রুপোলী ঘূর্ণীর মতো ক্ষত প্রজন্মের লালা মাখানো কর্কটক্রান্তীয় তিলভেজা চোখের মতো আরো অতি সুগন্ধিময় তাপীয় বহমান আর্দ্র বিভীষিকাময় ইমারজেন্সি কন্ট্রাসেপটিক ফ্লেভারের ডেরিফাইলাইন জল খাওয়া নারী ঘুরছে, নারী ছিঁড়ে ছিঁড়ে ভয়ানক যুদ্ধক্ষেত্রের পঞ্চ শায়রে নামছে ঠোঁট ভর্তি জল নিয়ে , জল তো কয়লার মতো অগ্নি শিখার…
-
সমুদ্র
মানুষ যা পায় সবখানি ভুলসমুদ্রের অতলে দাবানল, চেয়ে দ্যাখোচেয়ে দ্যাখো—সেই চোখের দাবানলে পুড়ছে শহরখসে খসে পড়ছে নক্ষত্র, আকাশ।তবুও—যে জোছনায় স্নান সেরে তুমি ফিরবে নক্ষত্রের পথেসমুদ্রে পাড়ে চেয়ে চেয়ে শরীর ভিজিয়ে—ঝিনুক কিংবা শঙ্খ কুড়িয়ে—পেয়েছো কী—দুঃখ, দুর্যোগ, দুর্ভিক্ষ।তা ছাড়া মানুষ পায় বা কী?
-
৩৬ জুলাই
নূরল দীন, মনে আছে, শহীদ আসাদ – আসহাবে কাফ?সেই যে ডেকে গেলে সেহেরির ডাক, জাগো বাহে…আবু সাঈদ সাড়া দিলো।আওয়াজ ছড়িয়ে গেলো সারা বাংলাদেশ। নূর হোসেন মনে আছে? জেগে আছে রক্তকরবীর কালতপ্ত বয়ে যায় অনন্ত রুধির ধারাগণতন্ত্রের পিতা-মাতা-ভাই-বোন সকলি মাকাল। সিধু-কানু কে যে ছিলো ভুলে গেছে বাংলাসাঁতালের ভূমি ও জীবন – দখল তোমার হলোসেও এক জুলাই…
-
কলমকে স্তব্ধ করা অত সহজ নয়
এ কোন দুঃসময়ে আমার বাস?এ কোন রাষ্ট্র?যেখানে মিইয়ে যায় কাব্যের ঘ্রাণ, থেমে যায় চেতনার স্পন্দন।যেখানে ছন্দেরা পথ হারায়,সুরেরা হয় গুম—আমি আজ চিৎকার করে কথা বলতেও ভয় পাই!বৈপ্লবিক পংক্তিমালা জুড়ে আজ ফ্যাসিবাদের থাবা,কী ভীষণ ত্রাস! বড্ড ভয়! জীবনের খাতা থেকে মুছে যাচ্ছে কত না বলা কথা,কত অব্যক্ত দহন— রাষ্ট্র কি নেবে এর দায়?শান্তি, প্রেম, বিদ্রোহ আর…
-
হারিয়ে যাওয়া
দৈনন্দিন চাপে পিষ্ট আমি;জীবন যেন এক অবিরাম ঘূর্ণিপাক।প্রতিটি সকাল শুধু ঘড়ির কাঁটার দাসত্ব,প্রতিটি রাত এক অবসাদ-মাখা ফাঁদ।কোথাও মুক্তি নেই,কোথাও যুক্তি নেই,কোথাও নেই থামার অবকাশ। আমি হাঁটি অসংখ্য মুখের ভিড়ে;অথচ আমি একা, ভীষণ একা – বিশ্বাস হয়?শব্দেরা চারপাশে নাচে,অথচ আমি বোবা, ভাষাহীন – বিশ্বাস হয়?কতবার ভেবেছি পালিয়ে যাব এই যান্ত্রিকতার লৌহশৃঙ্খল ছিঁড়ে;কতবার ভেবেছি ছুঁয়ে দেখব অজানা…
-
তোমারে দেখছিলাম
নদীর পারে বইসা আছিলাম,চারোদিকে আন্ধারপক্ষীরাজের ডানার শব্দ—মনে হয়, বাড়ি ফিরলো সকলে। আমার বাড়ি নদীতেই;পারে আসার সুবাদে তোমারে দেখছিলাম।আমি কিন্তু তোমারে আসলেই দেখছিলাম—ডাগর চোখে বিদ্রোহের ব্যাকুলতা, অসহায়!তুমি আমারে দেখোনাই। তুমি মনে হয় দেখছিলা উড়াল দেওয়া পাখি,শুনছিলা তাগো ডানার ভাষা।আবার অনেক দিন তোমারে দেখিনাই—অনেক বছর। আমার ঘর শুকায়া গেছে, বাড়ি হারাইয়া গেছে;আমি ঘরহারা হইয়া আশ্রয় নিলাম গাছের…
-
তোমার সন্তান আমি
তখন তোমার দৈন্য ছিল দরিদ্র ছিল না —কারণ তোমার দাস ছিল মানুষ ছিল নাদুঃখ ছিল তোমার বুকে, দিন আসত না।শিখাহীন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ছিল তোমার শহরআঁধারেই পেরিয়ে গেল কতটি বছর! তোমার প্রেমে মগ্ন ছিলাম মিলন হতো নাতোমার পাশে বসেও তোমায় ছোঁয়া যেত নাতোমার বুকের হৃদয় জুড়ে বিক্ষত বেদনা —তবু তোমায় ভালোবেসে তা ধরতে পারতাম না! তবু…
-
পরমের সাথে যোগাযোগ
তোমারে ধইরা নিছি তুমি পরম।তুমি এবসুলেট।ধইরাই নিছি তুমি কথার জবাব দিবা না।তবু আমি আশ্বস্ত হবো। শান্তি পাব।নির্ভার হবো। আমি পাব ভরসা।সেই ভরসায় আমি আমার মেন্টালপ্যারালাইজড ফেইজ পার হয়াবাস ধরব টোলারবাগের। ফুল নিয়াযাব তোমার বাসায়। তুমি জানবা না। আমিফুল নিয়া তোমার এলাকায় ঘুরাঘুরি কইরামোহাম্মদপুরের তুরাগে ফুল গুলা ভাসান দিবো।তুমি, তুমি জানবা না ভাসানের কথা।আরআমি দৌড়ে পালায়া…
-
রূপঝরা অপরূপ
সন্ধ্যা নেমে আসেনদীটির মোহনায়মাধুরী জল আনেমন মিশে অজানায়জানালার ধারে আঁকেহারালো সে কোন বাঁকেমায়া তবু ছায়া হয়এলোমেলো ভাবনা।বিছিয়ে নকশী কাঁথাঅদেখা স্বপ্নে বোনারাত কাটে অপেক্ষায়তুলে রাখা শীতল পাটি।বালিকা শুধাও দেখিভালোবাসো কতখানি?এলোমেলো রেশমিচুল,কুসুম কোমল জবাফুলবাতাসের সাথে খেলাএলোমেলো বয় বেলামাখনের স্পর্শ,দেবদারু বনফুলসুগন্ধে মাখামাখিখামে ভরা এলো চিঠিশিউলি কী বনফুলথিরথিরে রাঙা ঠোঁটচৈত্রের ক্ষরা নামেবুভুক্ষ তৃষ্ণাকতকাল অপেক্ষাসঞ্চিত বৃষ্টিটুপটাপ, টুপটাপবাঁধনে বাঁধে কারেমায়াময় দৃষ্টিবেলাডুব,…
-
সিরিজ কবিতা – ‘আমি’
আমি-১ আমি নিজেকে যখন গুছিয়েএকটি ধাতুর বাক্সেবন্ধ করে রাখি ;তখনই চিৎকার শোনা যায়ওপার থেকেআমার শীর্ণ শরীর নিঃশব্দেবেরিয়ে আসেঝড়ে পড়া পাকা কমলার মতোগড়িয়ে পড়েগুছিয়ে থাকা আমি! আমি-২ আমার অনুবাদেআমিযেখানে কোনো বিকৃতি ঘটেনাআমিই আমার ঈশ্বরযেখানে ছায়ার দৃশ্যমৃত্যুর মতোনউদাস। আমি-৩ আমি নাইলনের তৈরী একটি ভাঁড়প্লাস্টিকের চাঁদের ভিতররোজ ঢুকে পড়িপাসওয়ার্ড ভুলে যাইস্মৃতিহীন আটকে থাকিমৃত্যুর মন্ত্রে বেরিয়ে আসবোসেই অপেক্ষায়। আমি-৪…
-
শান্ত করো, প্রিয়তমা
আমাকে শান্ত করো, প্রিয়তমা!আমাকে শান্ত করোপ্রিয়তমা, আমাকে শান্ত করো!কোল হারা মায়ের কান্নাসন্তান হারানো পিতার অপলক দৃষ্টিভাই হারা বোনের আহাজারিখুন হওয়া প্রেমিকের লাশের পাশেপ্রেমিকার আত্ম চিৎকারপুলিশের গুলিতে শ্রমিকেরআকস্মিক মৃত্যুআমাকে ক্ষোভের আগুনে ভাসিয়ে দিচ্ছেআমি জ্বলে পুড়ে সশস্ত্র হয়ে উঠছিন্যায়ের আগুনে সশস্ত্র হয়ে উঠছিমুক্তির স্বাদে সশস্ত্র হয়ে উঠছিসমতার বারুদে সশস্ত্র হয়ে উঠছিবন্ধুত্বের বন্ধনে সশস্ত্র হয়ে উঠছিপ্রেমের গন্ধে সশস্ত্র…
-
শীতসংসারের পদাবলি
১ যখন বাড়িতে ফিরি ফ্রেমে এটে রেখে আসি স্মৃতি সম্বলিত জর্জরিত মেঘ আর পাশাপাশি ক্রমশ নিভে যেতে বিকেলের ছায়া, নিশ্চয়ই পিছনে কেউ ডেকেছিল সাড়া দিতে ফিরে দেখি করুণ চোখে অপেক্ষাকাতর মরিচীকা আর মায়া। ২ অনির্ধারিত বৈঠকে মাঝে মাঝে মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে যায়, উঠে বসি, মুখোমুখি নিজের সাথে অর্থহীন বিতর্কে মাতি, কিছুক্ষণে যথেষ্ট মিথ্যাচারে নিজেকে আরও…

